সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

পর্যটকশূন্য সেন্ট মার্টিনে বাড়ছে শামুক-ঝিনুক, জাগছে সবুজ প্যারাবন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে থাকা প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে পর্যটকদের আনাগোনা বন্ধ থাকায় দ্বীপটিতে ফিরে এসেছে সুনসান নীরবতা। আর এই সুযোগে সৈকতে বেড়েছে শামুক-ঝিনুকের অবাধ বিচরণ, সবুজ হয়ে উঠছে দ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তের দিয়ারমাথা ও ছেঁড়াদিয়া।

প্রতিবছর মার্চ মাস পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকলেও, এবার জানুয়ারির শেষেই বন্ধ করে দেওয়া হয় দ্বীপটিতে যাওয়ার পথ। যেখানে আগে প্রতিদিন পাঁচ হাজার পর্যটকের সমাগম ঘটতো, সেখানে এবার দুই মাসে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) প্রতিদিন মাত্র দুই হাজার পর্যটককে ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক জীবনের জন্য বিখ্যাত। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দ্বীপটিতে রয়েছে ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। এর মধ্যে রয়েছে প্রবাল, শৈবাল, কাছিম, শামুক, ঝিনুক, সামুদ্রিক মাছ, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও কাঁকড়া। বিলুপ্তপ্রায় জলপাই রঙের কাছিমের ডিম পাড়ার নিরাপদ স্থানও এই দ্বীপ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিবেশ দূষণের কারণে দ্বীপটি সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছিল।
সেন্ট মার্টিন
পর্যটকশূন্য দ্বীপটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তর বিশেষ উদ্যোগ নেয়। ড্রোনের সাহায্যে দ্বীপের আনাচে-কানাচে জমে থাকা বর্জ্য শনাক্ত করে সেগুলো অপসারণ করা হয়। দুই দিনের অভিযানে ৯৩০ কেজি বর্জ্য অপসারণ করা হয়, যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল চিপসের প্যাকেট, পলিথিন ও বিস্কুটের প্যাকেট।

পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, পর্যটকদের চলাচল এবং ইজিবাইক, টমটম ও মোটরসাইকেলের দৌরাত্ম্য বন্ধ থাকায় দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্ব ও পশ্চিম অংশের সৈকতে শামুক-ঝিনুকের আস্তরণ জমতে শুরু করেছে। এই শামুক-ঝিনুক বালুক্ষয় রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শুধু তা-ই নয়, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ছেঁড়াদিয়া ও দিয়ারমাথার দিকে এখন মানুষের পদচিহ্ন পড়ে না। ফলে সেখানকার সৈকতে অবাধে বেড়ে উঠছে সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ। দ্বীপের দক্ষিণ অংশে পাথরের স্তূপের ওপর এক একরের বেশি জায়গাজুড়ে বেড়ে উঠছে সবুজ প্যারাবন।

পর্যটকবাহী জাহাজের কারণে সমুদ্রের পানি ঘোলা হয়ে গেলেও এখন স্বচ্ছ নীল দেখাচ্ছে। সাগরে ভাসমান প্লাস্টিক বর্জ্যও তেমন চোখে পড়ছে না।
Saint Martin সেন্ট মার্টিন
সেন্ট মার্টিনের সুরক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। দ্বীপের বর্জ্য অপসারণের পর এবার স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বেকার লোকজনকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

দ্বীপের হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি জানিয়েছেন, ২৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট থাকলেও সেগুলোর কোনোটিরই পরিবেশ ছাড়পত্র নেই।

পরিবেশ সংগঠন ইয়েস-এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিলের মতে, প্রথমবারের মতো পর্যটক সীমিত করার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দ্বীপের পরিবেশ ও প্রতিবেশে। কঠোর নজরদারির ফলে এবার সমুদ্র থেকে প্রবাল আহরণ হয়নি। সৈকতে ভিড় কম থাকায় কাছিম নির্বিঘ্নে ডিম পাড়তে পেরেছে। লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকের বংশবিস্তার ঘটেছে।

সেন্ট মার্টিনের এই পরিবর্তন প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিকে একটু সুযোগ দিলেই সে আপন রূপে ফিরতে পারে।

পাঠকপ্রিয়