দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও সুরক্ষিত ও গতিশীল করতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, জেটি সংস্কার করা হয়েছে। সম্প্রতি, বন্দরের গেট সিস্টেমকে সম্পূর্ণ অনলাইন করা হয়েছে, যা আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়াকে সহজ করেছে। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি বন্দরের কার্যক্রমে গতি বাড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
কিন্তু এতসব উদ্যোগের পরও চট্টগ্রাম বন্দরের সামনে রয়ে গেছে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ। কর্তৃপক্ষের দাবি, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে বন্দর ব্যবহারকারীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
যেসব চ্যালেঞ্জ এখনো বিদ্যমান:
* ইয়ার্ডের বাইরে পণ্য খালাস: বিশ্বের উন্নত বন্দরগুলোতে বন্দরের ভেতরে পণ্য খালাসের সুযোগ নেই। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে এখনও বেশিরভাগ পণ্য বন্দরের ইয়ার্ডের ভেতরেই খালাস করা হয়। এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়। আইএসপিএস কোড অনুযায়ী বন্দর এলাকায় বাইরের অবাঞ্ছিত ব্যক্তির প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু পণ্য খালাসের কারণে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার গাড়ির চালক ও সহকারীকে বন্দরে প্রবেশ করতে হচ্ছে। ফলে, ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য, মাদক ও অস্ত্রের চালান আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
* স্ক্যানার সংকট: পর্যাপ্ত স্ক্যানার ও দক্ষ জনবলের অভাবে বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চীন থেকে চারটি কনটেইনার স্ক্যানার আমদানি করা হলেও গত ১৭ মাসেও সেগুলো বসানো হয়নি।
* আইসিডির সক্ষমতা: বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোর (আইসিডি) সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইসিডি মালিকরা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হলেও দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগী নন। অধিকাংশ আইসিডিতে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নেই।
* বিস্ফোরণের ঝুঁকি: বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে থাকা ২১৮টি কনটেইনারে সালফিউরিক অ্যাসিড, সোডিয়াম ও পটাশিয়াম হাইড্রোক্সাইডের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে। ১৫-২০ বছরের পুরোনো এসব রাসায়নিক কনটেইনার ভেঙে যাওয়ায় বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, “অনলাইন গেটপাসের মাধ্যমে বন্দর ব্যবহারকারীদের যানবাহন ট্রেকিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা আরও সহজ হবে, যানজট কমবে। বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার হবে এবং কার্যক্রমে গতিশীলতা বাড়বে।”
বন্দরের অন্যান্য বাধা প্রসঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক বলেন, “বন্দরকে সুরক্ষিত ও গতিশীল করতে বন্দর ব্যবহারকারীদের ইতিবাচক ভূমিকা প্রয়োজন। ফুল কন্টেইনার লোড (এফসিএল) পণ্য বাইরে খালাস করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিজিএমইএ আপত্তি জানিয়েছে। আইসিডির সক্ষমতা বাড়াতে এনবিআরকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
পণ্য খালাসের জটিলতা:
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিকবার এনবিআরকে চিঠি দিয়ে আমদানি করা সব পণ্য অফডকে খালাসের সুপারিশ করেছে। কিন্তু বড় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর আপত্তির কারণে এনবিআর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
আইসিডির সক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক:
ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইসিডি মালিকরা ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী হলেও দক্ষতা বাড়াতে মনোযোগী নন। অধিকাংশ আইসিডিতে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নেই। পণ্য খালাসের খরচও সেখানে বেশি। তাই তাঁরা আইসিডিতে পণ্য খালাস না করে বন্দর থেকে খালাস করতে আগ্রহী।
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, “বেশিরভাগ আইসিডিতে দক্ষ জনবল ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। … তাই বন্দর ও এনবিআরের উচিত তাদের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া।”
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ:
পণ্য খালাসের জন্য প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ হাজার বাইরের মানুষ বন্দরে প্রবেশ করায় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আনা, এমনকি অস্ত্র ও মাদক আসার মতো ঘটনাও ঘটছে।
স্ক্যানার স্থাপনে বিলম্ব:
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে চীন থেকে চারটি কনটেইনার স্ক্যানার আনা হলেও সেগুলো বসানোর কাজ এখনও শেষ হয়নি।
বিস্ফোরণের ঝুঁকি:
বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা পুরোনো রাসায়নিক পদার্থের কনটেইনারগুলো নিয়েও রয়েছে উদ্বেগের কারণ।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা জরুরি।