কক্সবাজারের রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের মিয়ানমার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার গর্জনিয়া বাজারটি এবার প্রায় ২৫ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। গত বছর এই বাজারের ইজারামূল্য ছিল প্রায় আড়াই কোটি টাকা। বাজারটি ইজারা নিয়েছেন রামু উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব তৌহিদুল ইসলাম। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সমর্থক ৪০ জনের বেশি নেতা-কর্মী-ব্যবসায়ী বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করবেন।
ইউনিয়ন পর্যায়ের এই বাজারের ইজারামূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসন, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের মতে, বাজারটি চোরাই গরু বিক্রির হাট ও মাদক চোরাচালানের ‘ট্রানজিট’ হিসেবে পরিচিত।
গত বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) রামু উপজেলা পরিষদের উন্মুক্ত দরপত্রে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে তৌহিদুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি ১৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা দর দেন, যা ভ্যাট ও করসহ প্রায় ২৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের জন্য রামু উপজেলার ১৩টি সরকারি হাটবাজারের নিলামে গর্জনিয়া বাজারের জন্য ৪৫টি ফরম বিক্রি হয়। সাতজন উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নেন।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, “ইউনিয়ন পর্যায়ের একটি বাজারের ইজারামূল্য ২৫ কোটিতে যাবে, কল্পনাতে ছিল না। সম্ভবত সারা দেশের মধ্যে গর্জনিয়া বাজার সর্বোচ্চ দামের ইজারা।”
তৌহিদুল ইসলাম জানান, তিনি একা নন, রামু, কক্সবাজার, ঈদগাঁও এলাকার বিএনপি সমর্থক ৪০ জন ব্যবসায়ী ও হোটেল-মালিক মিলে ‘বিজনেস ফোরাম’ গঠন করে বাজারটি ইজারা নিয়েছেন।
দৃশ্যমান ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও টাকার উৎস নিয়ে সমালোচনার জবাবে তৌহিদুল বলেন, তিনি জমিদার পরিবারের সন্তান এবং শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগ রয়েছে।
বাজারটির ইজারামূল্য বৃদ্ধির কারণ কী?
গর্জনিয়া বাজারটি রামু উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির কাছে অবস্থিত। বাজারটিতে প্রায় ৫০০টি দোকান রয়েছে। এ ছাড়া বাজারের অধীনে আরও দেড় কিলোমিটার দূরে গরু বিক্রির জন্য আড়াই কানির একটি মাঠ রয়েছে।
পুলিশ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীদের মতে, গত তিন বছরে গর্জনিয়া বাজার ‘দামি’ হয়ে ওঠে। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে আনা চোরাই গরু ও মাদকের কারণে বাজারটির গুরুত্ব বাড়ে।
২০২৪ সালে অন্তত ৩ লাখ গরু আনা হয় বলে জানা গেছে। গরুর বহরে ইয়াবা ও আইসও আনা হতো। মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো কম দামে গরুর সঙ্গে মাদক পাঠিয়ে বাংলাদেশ থেকে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করত।
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ আরাকান আর্মির দখলে চলে যাওয়ায় সেখানকার বিতাড়িত লোকজনের গৃহপালিত পশু কম দামে বাংলাদেশে আসছে। সঙ্গে আসছে মাদকও।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসরুরুল হক জানান, গরু ও মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ডাকাত শাহীনকে ধরার চেষ্টা চলছে।
এর আগে ২০২৩ সালে গর্জনিয়া বাজার ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য কমলের ঘনিষ্ঠজন ইউনুছ ভুট্টো।
২০২৪ সালে বাজারটি ২ কোটি ৩৭ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ইজারা পেয়েছিলেন কক্সবাজার সদরের বাসিন্দা আবদুর রহিম। তিনি জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত দিয়ে গরু আনা হলেও গর্জনিয়া বাজারে সেগুলো দেশি বলে বিক্রি করা হয়।
চোরাচালানের বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ওসি মাসরুরুল হক ও রামু থানার ওসি ইমন চৌধুরী জানান, তাঁরা নজরদারি রাখছেন এবং নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছেন।