সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

২৮ নারীর বন রক্ষার সংগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

দুর্গম বনে লাঠি ও ছাতা হাতে ঘুরে বেড়ান ২৮ জন নারী। পরনে সবুজ পোশাক। রোদ-বৃষ্টি তাঁদের আটকাতে পারে না। তাঁদের লক্ষ্য একটাই—বন রক্ষা করা। কেউ গাছ কাটতে এলে বাধা দেন। গত ১৯ বছর ধরে টেকনাফের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় এভাবেই কাজ করে চলেছেন তাঁরা।

২০০৬ সালে বন বিভাগ ও ইউএসএআইডির সহায়তায় গঠিত বেসরকারি সংগঠন ‘নিসর্গ নেটওয়ার্ক’-এর ব্যবস্থাপনায় টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কেরনতলী গ্রামের খুরশিদা বেগমের নেতৃত্বে গঠিত হয় এই ‘বন পাহারা দল’। শুরু হয় তাঁদের যাত্রা।

টেকনাফের বনাঞ্চল মানেই অস্ত্রধারী ডাকাত দলের আনাগোনা, অপহরণ আর বন্যপ্রাণীর আক্রমণের ভয়। কিন্তু এসবে দমে যাননি এই নারীরা। তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে রক্ষা পেয়েছে হাজারো গাছপালা। ছড়িয়ে পড়েছে সুনাম।

প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় দলের নেত্রী খুরশিদা বেগমের (৪৬)। তিনি জানান, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে তাঁদের পাহারা। চারজন করে সাতটি দলে বিভক্ত হয়ে তাঁরা বনের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। দুপুরের খাবারও সারেন বনের ভেতরেই। কেউ যেন গাছ না কাটে, আগুন না লাগায়—এসব দেখাই তাঁদের প্রধান কাজ।

ছোটবেলা থেকেই বনের সঙ্গে খুরশিদার গভীর সখ্য। বন্য প্রাণীর অবাধ যাতায়াত দেখেছেন, শুনেছেন ভয়ানক সব প্রাণীর গল্প। বনকে ভালোবেসেছেন, আর সেই ভালোবাসার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে জিতে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক ‘ওয়াংগারি মাথাই’ পুরস্কার।

কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশবিদ ওয়াংগারি মাথাইয়ের স্মরণে ২০১২ সালে এই পুরস্কার চালু করে ‘দ্য কলাবরেটিভ পার্টনারশিপ অব ফরেস্ট (সিপিএফ)’। খুরশিদা যখন এই পুরস্কার পান, তখন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন ৫০০ জন নারী। সবাইকে পেছনে ফেলে এই বিরল সম্মান অর্জন করেন তিনি।

খুরশিদা জানান, আগে নারীরা জ্বালানির জন্য অবাধে গাছ কাটতেন। এতে বন উজাড় হয়ে যাচ্ছিল। তিনি তাঁদের সঙ্গে কথা বলে, বিকল্প জ্বালানির পথ দেখিয়ে গাছ কাটা বন্ধে উদ্বুদ্ধ করেন। পরে ‘নিসর্গ সহায়তা প্রকল্প’-এর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গঠন করেন এই বন রক্ষা দল।

তবে বন রক্ষা করতে গিয়ে বহুবার বিপদেও পড়তে হয়েছে তাঁদের। হাতির সামনে পড়েছেন, সাপ-বানরের আক্রমণ ঠেকিয়েছেন। প্রথম দিকে অনেকে সমালোচনা করলেও এখন সবাই প্রশংসা করেন।

সম্প্রতি টেকনাফের জাদিমুড়া বনাঞ্চলে ১৯ জন বনপ্রহরীকে অপহরণের ঘটনায় তাঁদের মনেও আতঙ্ক বেড়েছে। অপহরণের শিকার হওয়ার ভয় এখন তাঁদের তাড়া করে ফেরে।

টেকনাফ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রশিদ জানান, বনপ্রহরী অপহরণের ঘটনার পর নারী পাহারা দলকেও সতর্ক করা হয়েছে। তাঁদের এখন টেকনাফ সড়কের পাশের বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

পাঠকপ্রিয়