কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভয়াবহ তহবিল সংকটের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) কর্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান বন্ধের ঘোষণার পর ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে এবং আরও আড়াই হাজারের বেশি কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুদান বন্ধের ঘোষণার পর থেকে আশ্রয়শিবিরগুলোতে কর্মরত এনজিওগুলো চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। ইতিমধ্যে কর্মী ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে তারা। গত এক মাসে ২৩টি আশ্রয়শিবিরে ১ হাজার ৪০০টির বেশি শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, আশ্রয়শিবিরে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা শিশুর জন্য ৪ হাজারের বেশি লার্নিং সেন্টার রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তহবিলের ওপর নির্ভরশীল কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যান্য শিক্ষাকেন্দ্রগুলোও তহবিল সংকটের মুখে বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
তহবিল সংকটের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার মাসিক খাদ্যসহায়তা সাড়ে ১২ মার্কিন ডলার থেকে কমিয়ে ৬ ডলারে আনার ঘোষণায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। কমিশনার মিজানুর রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এতে আশ্রয়শিবিরগুলোতে শিশুদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হবে, অপুষ্টি বাড়বে, চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে এবং কিশোর-তরুণরা মাদক ও সন্ত্রাসের পথে পা বাড়াতে পারে।
বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, আশ্রয়শিবিরগুলোতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি চালু থাকলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্মনিরোধক ব্যবহারে অনাগ্রহের কারণে জন্মহার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ৯৫টি শিশু জন্মগ্রহণ করছে, যা বছরে ৩০ হাজারের বেশি। এই বিপুলসংখ্যক শিশুর পুষ্টি ও শিক্ষা নিশ্চিত করা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার্স ফোরামের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, খাদ্যসহায়তা কমানোর ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য যে সামান্য অর্থ বরাদ্দ থাকবে, তা দিয়ে জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য রোহিঙ্গাদের বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় শিশুশ্রম, পাচার ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
সার্বিকভাবে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে তহবিল সংকট এবং খাদ্যসহায়তা হ্রাসের কারণে রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ না নিলে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।