সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

অস্ট্রেলিয়ার আকাশে এক বাংলাদেশি নক্ষত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

সিডনির প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে রবিন খুদা নামটি পরিচিত হলেও, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠার কারণ ছিল একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। রবিন খুদার প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারট্রাংক’কে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যে অধিগ্রহণ করে নেয় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্ল্যাকস্টোন ইনকরপোরেশন ও কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের (সিপিপি ইনভেস্টমেন্ট) নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম। এই অধিগ্রহণের ফলে রবিন খুদা সম্পদশালী ব্যক্তিদের তালিকায় উপরের দিকে উঠে আসেন।

সিরাজগঞ্জের ছাতিয়ানতলী গ্রামের সন্তান রবিন খুদার বাবা এস এম ওয়াজেদ আলী উচ্চমাধ্যমিক পড়তে ঢাকায় এসেছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। রবিন খুদার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় ও হারম্যান মেইনার কলেজে পড়াশোনার পর ১৯৯৭ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ায়। সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেন। একমাত্র ছেলেকে কাছে রাখতে রবিনের মা-বাবাও পরের বছর অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসেন।

২০০২ সালে স্নাতক শেষ করে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ করেন রবিন। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে, নিজের দক্ষতা ও একাগ্রতাকে পুঁজি করে দ্রুত উন্নতি করতে থাকেন। ২০০৭ সালে জাপানি প্রতিষ্ঠান ফুজিৎসুতে মহাব্যবস্থাপক পদে যোগ দেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ান টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি পাইপ নেটওয়ার্কের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। টেলিকমিউনিকেশন ব্যবসায় বিস্তর অভিজ্ঞতার পর ডেটা সেন্টার কোম্পানি নেক্সটডিসির নির্বাহী পরিচালক হন। ২০১৪ সালে টেলিকম পেমেন্ট কোম্পানি মিন্ট ওয়্যারলেসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব নেন।

২০১০-১১ সাল থেকেই ক্লাউড সেবার জনপ্রিয়তা রবিনকে আকৃষ্ট করে। অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফটের মতো বড় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও, তিনি ডেটা সেন্টার শিল্পে নতুন সম্ভাবনার পথ খুঁজে পান। কম খরচে, কম বিদ্যুৎ ব্যবহারে ক্লাউড স্টোরেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে ২০১৫ সালে যাত্রা শুরু করে এয়ারট্রাংক।

শুরুতেই ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ পায় এয়ারট্রাংক। পুঁজির অভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিলেও, রবিন হাল ছাড়েননি। নিজের জমানো টাকাসহ প্রায় সব সঞ্চয় বিনিয়োগ করে কাজ শুরু করেন। অবশেষে ২০১৭ সালের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি জগতে এয়ারট্রাংক এখন সুপরিচিত নাম। বর্তমানে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও জাপানে এয়ারট্রাংকের ক্লাউডসেবা চালু আছে। অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রতিষ্ঠানটির ১১টি ডেটা সেন্টার রয়েছে। আরও ৪০টি কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান একসময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারাই এখন ঋণের প্রস্তাব নিয়ে আসে। ব্ল্যাকস্টোন ও সিপিপি ইনভেস্টমেন্টের নেতৃত্বে একটি কনসোর্টিয়াম এয়ারট্রাংক অধিগ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক মূল্যমান ছিল ১০০ বিলিয়ন ডলার।

অধিগ্রহণের পরও রবিন খুদা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বহাল আছেন এবং কোম্পানিতে তাঁর মালিকানাও রয়েছে। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার ১০৯তম ধনী। গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ (এএফআর) পত্রিকা তাঁকে ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার’ হিসেবে সম্মানিত করে।

২০২০ সালে রবিন খুদা প্রতিষ্ঠা করেন ‘খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন’। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়ন ও কল্যাণে নিবেদিত এই ফাউন্ডেশন প্রযুক্তি খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন ও পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধেও সহায়তা করে। সম্প্রতি, এই ফাউন্ডেশন থেকে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা (১০০ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার) অনুদান দিয়েছেন রবিন।

কৃতী এই মানুষটি নীরবে কাজ করে যেতে চান। আলাপের শেষে রবিন বলেন, “অনেক ত্যাগ স্বীকার করে মা-বাবা আমাকে উন্নত জীবনের আশায় অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়েছিলেন। তাঁদের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরে আমি গর্বিত।”

পাঠকপ্রিয়