পবিত্র রমজান মাস জুড়ে চট্টগ্রামের বাজারে ভেজাল ও নকল খাদ্যপণ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীরা জনস্বাস্থ্যের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও বিপণনে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হলেও এই অশুভ চক্রকে সম্পূর্ণরূপে দমন করা যাচ্ছে না। ফলে একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতারা আর্থিকভাবে প্রতারিত হচ্ছেন, অন্যদিকে তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, চট্টগ্রামের অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল সয়াবিন তেল বাজারজাত করছে। তারা খোলাবাজার থেকে নিম্নমানের সয়াবিন তেল সংগ্রহ করে সেগুলোকে চট্টগ্রামের দেওদিঘী বাজারের পূর্ব পাশে অবস্থিত বাসায় স্থাপিত কারখানায় নিয়ে আসে। সেখানে ‘রূপচাঁদা’ ও ‘পুষ্টি’র মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের মোড়ক ব্যবহার করে বোতলজাত করা হয়। এসব বোতলে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) কোনো সিলমোহর থাকে না। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এক অভিযানে প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার খোলা ও বোতলজাত তেল, প্রায় সাত হাজার খালি বোতল, নোংরা তেলের ড্রাম ও মোটর জব্দ করা হয় এবং কারখানাটি সিলগালা করে মালিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
শুধু তেল নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় মসলার ক্ষেত্রেও চলছে ভেজাল মেশানোর ভয়াবহ কারবার। নগরের কর্নেলহাটের মেসার্স খাজা বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার করে নিম্নমানের মরিচ, হলুদসহ নানা মসলা তৈরি করছে। এরপর সেই ভেজাল পণ্যগুলোকেই আবার নামিদামি বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করা হচ্ছে।
রমজান মাসে ইফতারের একটি জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হচ্ছে আইসক্রিম। চট্টগ্রামের নামকরা প্রতিষ্ঠান পিংকু আইসবারও এই সুযোগে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদান দিয়ে আইসক্রিম তৈরি করছে। অনুমোদনহীনভাবে নোংরা পরিবেশে কুলফি, মালাই, চকবারসহ বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিমে মেশানো হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রং।
এছাড়া, ইফতারের বিভিন্ন সুস্বাদু খাদ্যপণ্যে দেদারসে ক্ষতিকর রং ও অননুমোদিত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি করা হচ্ছে সেমাইয়ের মতো জরুরি খাদ্যপণ্য।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ভেজাল কারবারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে অনেক পরিচিত ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের তথ্যমতে, পরিচালিত অভিযানের প্রায় ৮০ শতাংশ দোকানেই ভেজাল পণ্য এবং নানা ধরনের অনিয়ম পাওয়া গেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনও অনেকটা দিশেহারা। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সহ সচেতন নাগরিকরা এসকল ভেজাল কারবারিদের ‘গণদুশমন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ জানিয়েছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে ভেজাল উপাদান, ক্ষতিকারক রং ও কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা জানিয়েছেন, মেসার্স খাজা বাণিজ্য সংস্থা নোংরা পরিবেশে মানহীন মসলা বিভিন্ন কোম্পানির নামে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফারিস্তা করিম জানিয়েছেন, ভোজ্যতেলের সংকটের সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নকল ভোজ্যতেলের ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন মনে করেন, মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে খাদ্য অন্যতম। খাদ্যে ভেজাল মেশানোর মতো গুরুতর অপরাধের জন্য কেবল জেল-জরিমানাই যথেষ্ট নয়, বরং দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকা উচিত।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর চৌধুরীর মতে, মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের মূল কারণ হলো ভেজাল খাদ্য। ভেজাল ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে মানুষের শরীরে অনিরাময়যোগ্য রোগ বাসা বাঁধে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সার্বিকভাবে, চট্টগ্রামে ভেজাল খাদ্যপণ্যের এই রমরমা ব্যবসা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীদের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে এবং নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।