মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রাম মাতছে ওরস বিরিয়ানির স্বাদে, জানুন নেপথ্যের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে সম্প্রতি ওরস বিরিয়ানি নামে পরিচিত একটি বিশেষ ধরনের খাবার ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়কগুলোর পাশের রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং অস্থায়ী দোকানে এখন ওরস বিরিয়ানির সুঘ্রাণ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ এই বিরিয়ানির স্বাদ আস্বাদনে ভিড় জমাচ্ছেন। এটি কেবল একটি খাবার নয়, চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।

গতকাল (মঙ্গলবার) চট্টগ্রামের সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এক ভিন্নধর্মী দৃশ্য। ‘ওরস হাইলে আইয়ুন’ (ওরস হলে আসুন) নামে একটি শামিয়ানা টাঙিয়ে চলছে ওরস বিরিয়ানি বিক্রি। প্রতিদিন ইফতারের সময় প্রায় দুই থেকে আড়াইশো রোজাদার সেখানে সমবেত হচ্ছেন। সারিবদ্ধভাবে পাতা চেয়ার-টেবিলে বসে তাঁরা বিরিয়ানির স্বাদ নিচ্ছেন। এখানে ফুলপ্লেট বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায় এবং হাফপ্লেট ৭০ টাকায়। সাথে থাকছে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের স্বাদ।

এই বিরিয়ানি তৈরির কর্মযজ্ঞের নেতৃত্বে আছেন মোহাম্মদ হানিফ বাবুর্চি। তিনি জানালেন, “আমি প্রায় দেড় যুগ ধরে বিভিন্ন জায়গায় ওরস বিরিয়ানি রান্না করছি। এই বিরিয়ানির মূল রহস্য হলো চাল, মাংস, আলু এবং মসলার সঠিক অনুপাত। প্রতিটি উপকরণ নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যবহার করলে এবং সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করলে এর স্বাদ হয় অতুলনীয়।”

তিনি আরও জানান, এখানে সাতটি বড় ডেকচিতে বিরিয়ানি রান্না করা হয়, যা ইফতার থেকে শুরু করে সেহরি পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ১০০ জনের খাবারের চাহিদা মেটাতে পারে। প্রতিদিন ১১৫ কেজি গরুর মাংস, ১২০ কেজি চাল, ৫ কেজি আলু এবং ১ কেজি গাজর ব্যবহার করা হয় এই বিরিয়ানি তৈরিতে।

সিআরবিতে আসা রায়হান, ইউসুফ জানালেন, তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই বিরিয়ানির ছবি দেখে আকৃষ্ট হয়েছেন এবং স্বাদ নেওয়ার জন্য এসেছেন। ইফতারের পর সেলিম উদ্দিন বললেন, “অনেক দিন ধরেই ওরস বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছা ছিল। স্বাদ সত্যিই অসাধারণ।”

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে মইজ্জারটেক এলাকা এখন ওরস বিরিয়ানির জন্য প্রসিদ্ধ। মইজ্জারটেক থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের মিল্ক ভিটা গেট পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকান। এখানে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে লাকড়ির চুলায় বিরিয়ানি রান্না, মাংস কাটাকুটি এবং খাওয়া-দাওয়ার উৎসব। ওসমানি ওরস বিরিয়ানি, আকাশ ওরস বিরিয়ানি হাউস, কর্ণফুলী ওরস বিরিয়ানি, খাজা আজমির ওরস বিরিয়ানি সহ আরও অনেক দোকানে প্রতিদিন ভিড় করছেন ভোজনরসিকরা।

ওসমানি ওরস বিরিয়ানির কর্ণধার ওসমান গণি জানালেন, “গত নভেম্বরে আমি ওরস বিরিয়ানি বিক্রি শুরু করি। রমজান মাস শুরু হওয়ার পর থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ আমাদের এখানে বিরিয়ানি খেতে আসেন।”

তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রামে অনেক মাজার রয়েছে, এবং এখানকার মানুষ ওরসের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত। মাজারে ওরসের সময় তবরুক হিসেবে এই বিরিয়ানি খাওয়ানো হয়। রান্নার কৌশল এবং ব্যবহৃত মসলার কারণে এর স্বাদ হয় অনন্য। মূলত এই স্বাদের কারণেই ওরস বিরিয়ানির প্রতি মানুষের এত আগ্রহ।”
ওরস বিরিয়ানি
ওসমানি ওরস বিরিয়ানিতে বড় প্লেটের দাম ১১০ টাকা এবং ছোট প্লেটের দাম ৬০ টাকা। এছাড়াও রয়েছে মেজবানি মাংস এবং গরুর নলা। এখানে একসাথে প্রায় ২৫০ জন বসে খাবার খেতে পারেন।

ওরস বিরিয়ানি মূলত মাজারের তবরুক হিসেবে রান্না করা হতো। সুগন্ধি চাল, মাংস এবং বিভিন্ন ধরনের মসলার সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারটি মোগলদের হাত ধরে ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। বিরিয়ানি শব্দটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘বিরিঞ্জ’ থেকে, যার অর্থ ভাত।

চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার শরিফের সঙ্গে ওরস বিরিয়ানির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাইজভান্ডার নিয়ে গবেষণা করেছেন গবেষক সেলিম জাহাঙ্গীর। তিনি জানালেন, “প্রায় ১০০ বছর আগে চট্টগ্রামের মাইজভান্ডার দরবার শরিফে বার্ষিক ওরসের সময় আগতদের মধ্যে মাংস এবং ভাত বিতরণ করা হতো। তখন মাংস, ডাল এবং ভাত আলাদাভাবে রান্না করা হতো। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর দরবারে জনসমাগম অনেক বেড়ে যায়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখ লাখ মানুষ ওরসে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। এত মানুষের জন্য আলাদা আলাদা পদ রান্না করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তাই সময় বাঁচাতে চাল, মাংস এবং অন্যান্য উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে তবরুক রান্না শুরু হয়, যা বর্তমানে ওরস বিরিয়ানি নামে পরিচিত।”

তিনি আরও জানান, মাইজভান্ডার দরবার শরিফে দিনরাত জিকির-আসকার ও মিলাদ মাহফিলের পর এই তবরুক বিতরণ করা হতো।

কালের পরিক্রমায় মাইজভান্ডার দরবার শরিফ থেকে ওরসের এই তবরুক রান্না চট্টগ্রামের আরও বেশ কয়েকটি মাজারে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে আনোয়ারার ওষখাইন সৈয়দ আলী রজা কানু শাহ, তালসরা দরবার, চন্দনাইশের সাতবাড়িয়া দরবার উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন মাজারের রান্নাঘর থেকে এই বিরিয়ানি ধীরে ধীরে পৌঁছে গেছে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁগুলোর মেন্যুতে। চট্টগ্রাম নগরের ‘সেভেন ডেজ’ রেস্তোরাঁ ২০১৬ সাল থেকে ওরস বিরিয়ানি বিক্রি করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার জি এম মনোয়ার জানালেন, “আমাদের রেস্তোরাঁয় আরও অনেক রকমের খাবার থাকলেও ওরস বিরিয়ানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি।”

ওরস বিরিয়ানি চট্টগ্রামের খাদ্যসংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মিশেলে তৈরি এই খাবার ভোজনরসিকদের মন জয় করে নিয়েছে। এটি এখন চট্টগ্রামের অন্যতম জনপ্রিয় এবং পরিচিত একটি খাবারে পরিণত হয়েছে।

পাঠকপ্রিয়