সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আরসাপ্রধান আতাউল্লাহর গ্রেপ্তারে স্বস্তি ও শঙ্কা দুটোই আছে রোহিঙ্গা শিবিরে

নিজস্ব প্রতিবেদক

রোহিঙ্গা সংকট নতুন মোড় নিয়েছে র‍্যাবের হাতে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) প্রধান আতাউল্লাহ ওরফে আবু আম্বার জুনুনীসহ ১০ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনায়। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ থেকে তাদের গ্রেপ্তারের পর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে স্বস্তি ও শঙ্কা দুটোই বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে অধরা আতাউল্লাহর গ্রেপ্তার রোহিঙ্গা শিবিরে শান্তি ফেরাতে পারবে কিনা, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।

আতাউল্লাহর জন্ম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের সিকদারপাড়ায়। তবে, তার বেড়ে ওঠা পাকিস্তান ও সৌদি আরবে। ১৯৬০-এর দশকে তার বাবা পাকিস্তানে চলে যান। সেখানেই আতাউল্লাহর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের মক্কায় পড়াশোনা করেন। ২০১২ সালে সৌদি আরব থেকে হঠাৎ করেই তিনি নিখোঁজ হন। এরপর ২০১৬ সালে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে সীমান্তচৌকিতে হামলার মাধ্যমে তিনি আলোচনায় আসেন। ধারণা করা হয়, তিনিই সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন আরসা গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর চৌকিতে হামলার ঘটনার পর আরসা নামটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো নৃশংস অভিযানের মুখে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে আশ্রয় নেয়। অভিযোগ রয়েছে, এই আশ্রয়শিবিরগুলোতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আরসা সক্রিয় হয়ে ওঠে। হত্যা, অপহরণ, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে সংগঠনটির বিরুদ্ধে।

আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্তের শূন্যরেখায় মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন ডিজিএফআই কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার রিজওয়ান রুশদী। এই হত্যা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি আতাউল্লাহ।

এছাড়াও ২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উখিয়ার কুতুপালংয়ে গুলি করে হত্যা করা হয় আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহকে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আতাউল্লাহকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা আতাউল্লাহর নির্দেশের কথা স্বীকার করেছে।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজার ব্যাটালিয়নের সদ্য বদলি হওয়া অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, র‍্যাব গত এক বছরে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে অভিযান চালিয়ে আরসার শীর্ষ সন্ত্রাসী, সামরিক কমান্ডারসহ ১২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ সময় ৫৮ কেজি বিস্ফোরক দ্রব্য, ৭৮টি দেশি ও বিদেশি অস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড, হ্যান্ড মাইন ও গুলি জব্দ করা হয়েছে।

পুলিশ, র‍্যাব ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত সাড়ে ৭ বছরে আশ্রয়শিবিরগুলোতে ২৫২ জন রোহিঙ্গা খুন হয়েছেন। এর মধ্যে চলতি বছরেই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৭ জন। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরসা, আরএসও এবং রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

রোহিঙ্গা নেতারা জানান, ২০১৮ সাল পর্যন্ত আরসা আশ্রয়শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পর তারা জনসমর্থন হারাতে শুরু করে। আতাউল্লাহসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের খবরে আরসা সদস্যদের মনোবল ভেঙে গেছে। তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, আরএসওসহ অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো তাদের পালানো ঠেকাতে তৎপরতা চালাচ্ছে। ফলে আশ্রয়শিবিরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আরসা প্রধানের গ্রেপ্তার নিঃসন্দেহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় সাফল্য। তবে, রোহিঙ্গা শিবিরে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও বহুমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। আশ্রয়শিবিরে নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। আরসার মতো সংগঠনগুলোর উগ্রপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আশ্রয়শিবিরের বাসিন্দাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আতাউল্লাহর গ্রেপ্তার রোহিঙ্গা সমস্যার একটি দিকের সমাধান মাত্র। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন সমন্বিত প্রচেষ্টা।

পাঠকপ্রিয়