বনরক্ষায় নিয়োজিত বন কর্মকর্তা ও কর্মীরা প্রায়ই বনদস্যু ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বন রক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি প্রাণ হারাচ্ছেন বন বিভাগের কর্মীরা। সম্প্রতি এ ধরনের আক্রমণ ও হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন বন কর্মকর্তা ভূমিদস্যু ও বনদস্যুদের হামলায় নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির হাজারিখীল এলাকায় প্রথম একজন বন কর্মকর্তা হত্যার শিকার হন। এরপর ১৯৮৫ সালে দুজন, ২০১৮ সালে একজন, ২০২০ সালে একজন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে একজন বন কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও, গত চার বছরে বন বিভাগের সাতটি জেলায় ১৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ২৯২ জন বন কর্মকর্তা ও রক্ষী আহত হয়েছেন।
হামলার ঘটনাগুলোর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। গত বছরের ৩১ মার্চ গভীর রাতে উখিয়ার সংরক্ষিত বনে পাহাড় কাটার খবর পেয়ে বিট কর্মকর্তা সাজ্জাদুজ্জামান তাঁর এক সহকর্মীকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে পৌঁছামাত্রই অভিযুক্তরা তাঁকে ট্রাকচাপা দিয়ে পালিয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা ২০২০ সালের এপ্রিলে মহেশখালীতে ঘটেছিল, যেখানে বনের জায়গায় পানের বরজ নির্মাণে বাধা দিতে গিয়ে বন কর্মকর্তা মো. ইউসুফকে হত্যা করা হয়।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তাদের লোকবল-সংকট প্রকট। সেই সঙ্গে বনরক্ষীদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রও বেশ পুরনো। অন্যদিকে, বনদস্যুদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র থাকে। ফলে, অবৈধ দখল ঠেকাতে বা উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলেই বন বিভাগের কর্মীরা হামলার শিকার হচ্ছেন। বন বিভাগের অভিযোগ, মূলত রাজনৈতিক নেতাদের উসকানি ও ক্ষমতাসীনদের মদদে বনের জমি দখল, কাঠ কাটা ও পাচারের ঘটনা ঘটে। তবে রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ করা হয়, বন বিভাগের লোকজন ঘুষ নিয়ে উচ্ছেদ-বাণিজ্য করে।
বন ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর সদস্যসচিব শরীফ জামিল বলেন, বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর চাপে থাকা বনাঞ্চল সংরক্ষণে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও জবাবদিহির অভাব দীর্ঘদিনের। সুশাসনের অভাবে রাজনৈতিক সরকারের আমলে বন সংরক্ষণে আন্তরিক প্রচেষ্টা দেখা যায়নি, বরং গোষ্ঠীস্বার্থ চরিতার্থ করতে বন ধ্বংস করা হয়েছে।
বন বিভাগের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগে। এখানে ৩৪টি হামলায় ৪৮ জন আহত হয়েছেন। নিহত সাজ্জাদুজ্জামান কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনেই কর্মরত ছিলেন। হামলার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে, যেখানে ২৮টি হামলায় ৮৫ জন আহত হয়েছেন। এসব হামলার ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য অধিদপ্তরের কাছে নেই।
বিট কর্মকর্তা সাজ্জাদুজ্জামান হত্যার ঘটনায় পুলিশ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে। তবে মামলার ধীরগতিতে সাজ্জাদুজ্জামানের পরিবার হতাশ। তাঁরা বন বিভাগের কাছে একজন আইনজীবী চেয়েও পাননি। সাজ্জাদুজ্জামানের স্ত্রী ও সন্তান বন বিভাগের সহায়তায় কোনোমতে জীবনযাপন করছেন।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতাদের একাংশকে বন দখলের পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। জামালপুরের সখীপুরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আজম খান বন বিভাগকে হুঁশিয়ার করে দেন, যাতে বনের জায়গায় থাকা কোনো ঘরে হাত না দেওয়া হয়। টাঙ্গাইল বন বিভাগের কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আজম খানের হুঁশিয়ারির পর তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং উচ্ছেদের কাজ আপাতত বন্ধ রেখেছেন। গাজীপুরেও একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বনের ভেতর দিয়ে রিসোর্টের জন্য সড়ক নির্মাণে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছিল।
বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, রাতের দিকে বনভূমি জবরদখলের ঘটনা বেশি ঘটে। এ কারণে রাতের বেলায় বন কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনাও বেশি ঘটে।
বন অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ইশতিয়াক উদ্দিন আহমদ বলেন, বনের অবৈধ দখলকে উৎসাহিত করার কারণেই হামলার ঘটনা বাড়ছে। তিনি মনে করেন, বন বিভাগের জমি দখলের কোনো বিচার না হওয়ায় বন অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে এবং হামলার ঘটনা ঘটছে।
বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন অধিদপ্তরের অধীনে মোট বনভূমি রয়েছে ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০৯ একর। এই বিশাল বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন মাত্র ১০ হাজার ৫০৭ জন কর্মী। অর্থাৎ, প্রতি একজন কর্মী গড়ে ৬০৫ একর বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
জনবল-সংকটের পাশাপাশি বন বিভাগের নিরাপত্তাকর্মীদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রও পুরোনো। তাঁদের কাছে থাকা এসএলআর রাইফেল, থ্রি-নট-থ্রি কিংবা কাটা রাইফেলগুলো সেকেলে এবং অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর। অন্যদিকে, বনদস্যুদের হাতে থাকে আধুনিক অস্ত্র।