সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বন উজাড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিরি-ছড়া: পার্বত্য চট্টগ্রামে বাড়ছে পানির সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরিগুলো আজ হুমকির মুখে। নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে পানির উৎসগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুম শুরু হতেই পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দুর্গম এলাকার বাসিন্দারা।

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার নয় মাইল এলাকার বাসিন্দা ও সাবেক মেরুং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য গণেশ ত্রিপুরা জানান, তাঁদের এলাকার বেতছড়ি ঝিরিটি আট মাইল এলাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে মাইনী নদীতে মিশেছে। কিন্তু বর্তমানে ঝিরিটিতে পানি কমে এসেছে। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে এটি মৃতপ্রায় হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ঝিরি শুকিয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক বন কমে যাওয়া। পাহাড়ের পাদদেশে ঘন বন থাকলে শুষ্ক মৌসুমেও পানির প্রবাহ থাকে। কিন্তু এখানে প্রাকৃতিক বন নেই, রয়েছে প্রচুর সেগুন বাগান। সেগুন গাছ পানি শোষণ করে বলে এর আশপাশের ঝিরিগুলোতে পানির প্রবাহ কমে যায় বা থাকে না।

স্থানীয় বাসিন্দা কবিতা ত্রিপুরা ও তপন ত্রিপুরা জানান, ঝিরির উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো এই সময়ে খুব কষ্টে পড়ে। অনেককে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। তাঁরা মনে করেন, ঝিরিগুলো বাঁচানো গেলে সারা বছরই পানির প্রবাহ থাকবে।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, নির্বিচারে বন উজাড় এবং সেগুনসহ বিভিন্ন বিদেশী প্রজাতির গাছের মনোকালচারের (এক ধরনের গাছের চাষ) কারণে ছড়াগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন সোসাইটি অব সিএইচটির সংগঠক সাথোয়াই মার্মা বলেন, ঘন বন যেখানে আছে সেখানে পানির প্রবাহ ভালো থাকে। ঝিরিগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকার মানুষেরা বেশি কষ্টে আছেন। তাঁরা ঝিরির পানি ব্যবহার করেন। বন উজাড় করে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণেই এই অবস্থা তৈরি হয়েছে। এভারগ্রিন ফরেস্ট (চিরসবুজ বন) ফিরিয়ে আনতে পারলে ঝিরি ও ছড়াগুলোকে বাঁচানো সম্ভব হবে।

খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা জানান, সম্প্রতি গাছপালা কেটে পাহাড় ন্যাড়া করে কৃষিকাজ করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রজাতির বৃক্ষ রোপণের প্রবণতা বেড়েছে। এতে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। পুরো পাহাড় ন্যাড়া করে কৃষির আবাদ করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বন হচ্ছে পানির আধার। দেশীয় প্রজাতির চিরসবুজ বৃক্ষ দিয়ে বনায়ন করার জন্য বন বিভাগ সচেতনতা সৃষ্টি করছে। বিভিন্ন উঠান বৈঠকে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে এবং ভালো ফল পাওয়া যাচ্ছে। তবে, পুনরায় বন ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঝিরি ও ছড়ায় প্রাণ ফেরাতে প্রাকৃতিক বন পুনরুজ্জীবিত করার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী ও স্থানীয়রা।

পাঠকপ্রিয়