দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি। সবুজে মোড়া পাহাড়, আঁকাবাঁকা নদী আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এই জেলায় লুকিয়ে আছে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু বন উজাড় আর দখলের কারণে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো এখানকার বনভূমিও আজ হুমকির মুখে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতেও খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নের বড় কাঙড়াখাইয়া গ্রাম এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। স্থানীয় বাসিন্দাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর বৌদ্ধ বিহারের নিয়ম-কানুনের মেলবন্ধনে এখানকার প্রায় শত একরের বেশি বনভূমি হয়ে উঠেছে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
যেভাবে এল পরিবর্তন
জেলা সদর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বড় কাঙড়াখাইয়ার অবস্থান। গ্রামটি মূলত চাকমা নৃগোষ্ঠীর বসতি। যুগ যুগ ধরে তারা এই বনের উপর নির্ভর করেই জীবন ধারণ করে আসছে। প্রায় এক যুগ আগে গ্রামের মানুষ মিলে সেখানে একটি বৌদ্ধ বিহার স্থাপন করে। বিহার থেকে নিয়ম করে দেওয়া হয়, অনুমতি ছাড়া কেউ গাছ কাটতে পারবে না, শুধুমাত্র বাঁশ কাটা যাবে তাও নিয়ম মেনে। আর সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রাণী হত্যা এখানে একেবারেই নিষিদ্ধ।
এই নিয়মগুলো গ্রামের মানুষ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আসছে। ফলস্বরূপ, বড় কাঙড়াখাইয়া বন প্রাণীদের জন্য ‘অভয়াশ্রম’-এ পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, পাহাড়ের ঝিরিগুলোও রক্ষা পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে যখন অন্যান্য জায়গার ঝিরিগুলো শুকিয়ে যায়, তখনও এই বনের ঝিরিগুলোতে পানির ধারা বজায় থাকে। ফলে পাহাড়িরা চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত পানি পায়, যা তাদের জীবনযাত্রায় এনেছে স্বস্তি।
প্রাণ ও প্রকৃতির মেলবন্ধন
বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রীদের কাছে বড় কাঙড়াখাইয়া বন এক অপার বিস্ময়ের নাম। এখানে প্রায় শত প্রজাতির প্রাণী রয়েছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায়। মুখপোড়া হনুমান, মায়া হরিণ, বন্য শূকর, কালো কাঠবিড়ালী – এরা সবাই এই বনের বাসিন্দা। সাম্প্রতিককালে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য কোনো বনে দেখা মেলেনি, এমন প্রাণীও এখানে রয়েছে, যেমন – লাল উড়ন্ত কাঠবিড়ালী বা ‘ছলক’।
পাখিদের জন্যও এই বন এক স্বর্গরাজ্য। বাংলাদেশে যত প্রজাতির হরিয়াল দেখা যায়, তার প্রায় সবই এই বনে আছে। সম্প্রতি দেখা মিলেছে গেঁজলেজ হরিয়ালের। হবিগঞ্জের সাতছড়ি বন এবং বান্দরবানের পর খাগড়াছড়ির এই বনে এই প্রজাতির হরিয়াল দেখা গেছে। এছাড়া দুর্লভ লাল মাথা কুচুকুচি, পাকড়া ধনেশ, জলপাই বুলবুল, বন মোরগ, সবুজ ঘুঘু, কালো মাথা বুলবুল, কালো মথুরা, বড় কাবাসি, পাহাড়ি ময়না, এশীয় দাগী প্যাঁচা, কমলা বুক হরিয়াল, ল্যাঞ্জা হরিয়াল, এশীয় নীল পরী, ঠোঁট মোটা হরিয়াল, ছোট হরিয়াল, নীল দাঁড়ি সুইচোরা, সিঁদুরে মৌটুসি, ইন্ডিয়ান রোলার, বন কোকিলের মতো পাখিরাও এই বনের শোভা বাড়ায়।
শুধু প্রাণী নয়, উদ্ভিদের বৈচিত্র্যেও বড় কাঙড়াখাইয়া অনন্য। এখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী সব গাছ। তাদের শরীর বেয়ে নেমে আসে সূর্যের আলো। এই গাছগুলো বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়। শতবর্ষী ভাদি, ফুলশুমারী, কড়ই, বিশাল আকারের বন শিমুল, সোনালু, চাপালিশ, নাইচিচা উদাল, ফাইশ্যা উদাল, অশ্বত্থ, কামালা ফল, মেহগনি, বড় ডুমুর, গর্জন, চিকরাশি, ঢেউয়া, বাজনা, মান্দার, নাগেশ্বর সহ আরও অনেক গাছ এখানে টিকে আছে।

ঝিরি ও জলের গল্প
পাহাড়ের প্রাণ হলো ঝিরি। এই ঝিরিগুলোই স্থানীয় মানুষের চাষাবাদ ও দৈনন্দিন কাজের জলের উৎস। কিন্তু দখল আর অপরিকল্পিত বৃক্ষায়নের কারণে অনেক ঝিরি আজ মৃতপ্রায়। বড় কাঙড়াখাইয়া এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানকার ঝিরিগুলোতে শুষ্ক মৌসুমেও জলের প্রবাহ থাকে। গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়শংকর চাকমা বলছিলেন, “বনটি থাকার কারণে পাহাড়ের নিচের ঝিরিগুলোতে শুষ্ক মৌসুমেও পানির প্রবাহ থাকে। যেসব পাহাড়ে সেগুন বাগান রয়েছে, সেসব পাহাড়ের নিচের ঝিরিগুলো এই সময়ে প্রায় শুকিয়ে যায়। কিন্তু এখানে বন অক্ষত থাকায় ঝিরিগুলোতে সারাবছর জল থাকে।”
এই জল গ্রামের কৃষকদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। পাহাড়ের নিচে প্রায় ১০ একরের বেশি জমিতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ করা হয়। ঝিরির জল ব্যবহার করে সেচের কাজ চালানো হয়।
‘সেগুন নেই, তবুও সবুজ’
বড় কাঙড়াখাইয়া বনের আশেপাশে বেশ কয়েকটি সেগুন বাগান রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, সেগুন পরিবেশের জন্য উপকারী নয়, বরং এটি বনের ভারসাম্য নষ্ট করে। সেগুন প্রচুর পরিমাণে জল শোষণ করে। ফলে সেগুন বাগান সংলগ্ন ঝিরিতে জলের প্রবাহ কমে যায়।
গ্রামের বাসিন্দা সুমিত্র চাকমা বলেন, “প্রাকৃতিক বনের সুফল এখানকার মানুষ পাচ্ছে। তবে এই বনে প্রবেশের আগে বেশ কিছু সেগুন বাগান রয়েছে। সেখানকার ঝিরিগুলো শুকনো, পানির প্রবাহ নেই। অনেকে লাভের আশায় সেগুন লাগালেও প্রকৃতির ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের মানুষ প্রাকৃতিক বনের গুরুত্ব বোঝার পর থেকে বিহার সংলগ্ন এলাকার শত একরের পাহাড়ি বন থেকে কোনো গাছ কাটা হয় না।”
ভবিষ্যতের পথ
বড় কাঙড়াখাইয়ার এই সাফল্য আমাদের দেখাচ্ছে যে, স্থানীয় মানুষের সচেতনতা ও সদিচ্ছা থাকলে প্রকৃতিকে রক্ষা করা সম্ভব। খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা জোর দিয়েছেন প্রাকৃতিক বন রক্ষা ও সংরক্ষণের উপর। তাঁর মতে, “বন মানে শুধু গাছপালা নয়। বনের উদ্ভিদের পাশাপাশি সেখানে বন্যপ্রাণীও থাকতে হবে। সবটা মিলিয়েই বন। পাখি সহ বন্যপ্রাণী বনায়নে সহায়তা করে। চিরসবুজ প্রজাতি এবং পাখি ও প্রাণীর খাবার উপযোগী প্রচুর গাছ লাগানো উচিত। সেগুন প্রকৃতির জন্য উপকারী নয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এসব প্রজাতি অবদান রাখতে পারে না।”
বড় কাঙড়াখাইয়ার এই মডেল অনুসরণ করে যদি পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বনগুলোকেও রক্ষা করা যায়, তাহলে তা আমাদের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে।