মিয়ানমারের মান্দালয় থেকে আসা শক্তিশালী এক ভূমিকম্পের কম্পন সম্প্রতি বাংলাদেশজুড়ে অনুভূত হয়েছে, যা দেশের কোটি কোটি মানুষকে এক অনাগত বিপদের কথা যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিল। উৎপত্তিস্থল বহুদূরে হওয়ায় এবারের মতো বাংলাদেশ সরাসরি ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বেঁচে গেলেও, এই ঘটনা বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে তীব্রতর করেছে – একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে বাংলাদেশের অনেক কাছে, যার বিধ্বংসী প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে জনসমুদ্র রাজধানী ঢাকা। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে নেমে আসা বিপর্যয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশ কতটা অপ্রস্তুত।
গত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশে ভূকম্পন অনুভূত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে। উদ্বেগজনকভাবে, চলতি বছরের শুরুতেও একাধিকবার কেঁপে উঠেছে দেশ, যার প্রতিটি উৎস ছিল দেশের বাইরে – মিয়ানমার বা চীনের মতো পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। বিশেষজ্ঞরা এই বহিরাগত কম্পনগুলোকে নিছক рядовое ঘটনা হিসেবে দেখতে নারাজ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, এই ছোট কম্পনগুলো হয়তো ভূগর্ভে জমে থাকা শক্তি কিছুটা মুক্ত করে দিচ্ছে, কিন্তু এর উল্টোটাও সত্যি হতে পারে – এগুলো হয়তো একটি অতি শক্তিশালী ঝাঁকুনির পূর্বলক্ষণ। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, পরিস্থিতি যাই হোক, বাংলাদেশকে অবশ্যই বড় ভূমিকম্প মোকাবিলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে হবে, কেননা ঝুঁকির মাত্রা বিশাল।
ইতিহাসও একই সাক্ষ্য দেয়। বিগত কয়েক শতাব্দীতে এই অঞ্চল একাধিক ভয়াবহ ভূমিকম্পের শিকার হয়েছে। ১৭৬২ সালে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৮.৫ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প এবং তৎসৃষ্ট সুনামির ক্ষত আজও ইতিহাসের পাতায় জীবন্ত। এরপর ১৮৬৯ সালে সিলেটের কাছে ৭.৫ মাত্রা, ১৮৮৫ সালে সিরাজগঞ্জে, ১৮৯৭ সালে ৮ মাত্রার ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়েক’, ১৯০৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ মাত্রা এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ অস্থিরতার প্রমাণ।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতি ১০০ থেকে ১৫০ বছরে একটি ৭ মাত্রার এবং ২৫০ থেকে ৩০০ বছরে একটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প এই অঞ্চলে আঘাত হানার চক্রাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ভূতাত্ত্বিক সময়চক্র অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন একটি বড় ভূমিকম্পের মুখোমুখি হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
আর এই সম্ভাব্য মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি কম্পিত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা একবাক্যে স্বীকার করছেন, একটি বড় ভূমিকম্পের আঘাতে ঢাকা পরিণত হতে পারে এক মৃত্যুপুরীতে। এর কারণ বহুবিধ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যেমনটা ব্যাখ্যা করেছেন, ঢাকার মাটির গঠন সবখানে এক নয়। পুরান ঢাকা থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার মাটি প্লাইস্টোসিন যুগের শক্ত লাল মাটি হলেও, গত কয়েক দশকে শহরের বর্ধিত অংশ – কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, পূর্বাচল, নারায়ণগঞ্জের বহুলাংশ গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমির নরম পলিমাটির ওপর। এর বেশিরভাগই আবার ভরাট করা জলাভূমি।
ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী মেক্সিকো সিটির ১৯৮৫ সালের ভূমিকম্পের উদাহরণ টেনে বলেন, উৎপত্তিস্থল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে হওয়া সত্ত্বেও শহরের দুর্বল মাটিতে গড়ে ওঠা অসংখ্য ভবন সেদিন ধসে পড়েছিল, কেড়ে নিয়েছিল ১৫ হাজার প্রাণ। ঢাকার ভরাট করা খাল-বিল-জলাভূমির ওপর অপরিকল্পিতভাবে গজিয়ে ওঠা হাজার হাজার ভবনও একই রকম ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এমনকি উন্নত পাইলিং প্রযুক্তিতে নির্মিত ভবনও মাটির দুর্বলতার কারণে ধসে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিপদ কেবল ভবন ধসেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধারকাজ চালানোও ঢাকায় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। পুরনো এবং নতুন ঢাকার অসংখ্য সরু গলি, ভবন ধ্বংসস্তূপে বন্ধ হয়ে যাবে। ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার পথ পাবে না। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব ভবনও নিরাপদ থাকবে কিনা সন্দেহ। মেট্রোরেলের মতো বিশাল কাঠামো কিংবা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে যদি ভেঙে পড়ে, তবে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়বে। ভূমিকম্পের সময় সাধারণ মানুষের আশ্রয় নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব ঢাকাকে তুরস্কের ভূমিকম্প বিধ্বস্ত শহরগুলোর চেয়েও নাজুক অবস্থায় ফেলেছে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান আরও একটি ভয়াবহ বিপদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন– ভূমিকম্পের কারণে বৈদ্যুতিক লাইন ছিঁড়ে বা গ্যাসলাইন ফেটে লাগা আগুন। সব মিলিয়ে, ঢাকা যেন আগুন, ভাঙন আর মানবিক বিপর্যয়ের এক টাইম বোমার ওপর বসে আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, এই ভয়াবহ ঝুঁকি নিরসনে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের অভাব অত্যন্ত প্রকট। বিশেষজ্ঞরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে, বিশেষ করে ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পের পর থেকে ক্রমাগত সতর্ক করে আসছেন। ড. আনসারীর মতো বিশেষজ্ঞরা রানা প্লাজা পরবর্তী সময়ের মতো ঢাকার ভবনগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষা ও সার্টিফিকেশনের দাবি জানিয়ে আসলেও, তা কর্ণপাত করা হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, নীতিনির্ধারকরা কখনও বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি, আবার কখনও আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে নতি স্বীকার করে নগর পরিকল্পনা ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রণীত ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল এই পরিকল্পনা ঢাকার মতো একটি জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ শহরের ভূমিকম্পের সামগ্রিক ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট নয়, বিশেষ করে যখন মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং অনিয়ম সুস্পষ্ট।
ছোট ছোট ভূমিকম্পগুলো যখন বারবার সতর্কবার্তা দিয়ে যাচ্ছে, তখন বড় ধরনের একটি ভূমিকম্পের আঘাতে অপরিকল্পিত ও অপ্রস্তুত ঢাকা মহানগরীর কী পরিণতি হবে, তা কল্পনা করাও কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সময় কথার ফুলঝুরি বা কাগুজে পরিকল্পনা ছেড়ে বাস্তবসম্মত, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই আসন্ন মহাবিপদ মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করার। নতুবা, একটি ভয়াল ভূমিকম্প হয়তো বাংলাদেশের রাজধানী ও তার ইতিহাসের গতিপথকেই চিরতরে বদলে দেবে।