কর্ণফুলীর কলতান আর লুসাই পাহাড়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে জেগে থাকা চট্টগ্রাম শহর। ১৮৬৩ সালে পৌরসভা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ নগর হয়ে ওঠার পথটা ছিল দীর্ঘ। শহর বাড়ার সাথে সাথে প্রয়োজন পড়লো আধুনিক বিপণিবিতানের। সেই প্রয়োজনের তাগিদেই পৌরসভা হওয়ার প্রায় একশ বছর পর, ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম পেলো তার প্রথম বহুতল, আধুনিক শপিং মল – ‘বিপণী বিতান’, যা জনসাধারণের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলো ‘নিউমার্কেট’ নামে। এটি কেবল একটি মার্কেট ছিল না, ছিল তৎকালীন চট্টগ্রামের আভিজাত্য আর আধুনিকতার প্রতীক, শহরের প্রথম চলন্ত সিঁড়িযুক্ত আইকনিক স্থাপনা।
নামের পেছনেও আছে ইতিহাস। যেমনটা কলকাতার ধর্মতলার হগ মার্কেট পরিচিতি পেয়েছিল ‘নিউমার্কেট’ নামে, চট্টগ্রামের এই নতুন বাজারটিও লোকমুখে হয়ে যায় নিউমার্কেট। আসল নাম ‘বিপণী বিতান’ যেন ঢাকা পড়ে যায় এই ডাকনামের আড়ালেই। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নির্মিত এই বিপণিবিতানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন ১৯৬১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খান এবং এর নামকরণ করেন সিডিএ’র তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা এ বি চৌধুরী। খ্যাতনামা স্থপতি ফিদা হোসেনের নকশায় ২ লাখ ৬০ হাজার বর্গফুটের বিশাল পরিসরে গড়ে ওঠা এই মার্কেটে আলো-বাতাস আর চলাচলের জন্য প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার বর্গফুট জায়গা খালি রাখা হয়েছিল, যা আজকের ঘিঞ্জি বিপণিকেন্দ্রগুলোর তুলনায় ছিল কল্পনাতীত। মাঝখানের সবুজ চত্বর আর নার্সারি এর নান্দনিকতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
এক ছাদের নিচে সব পাওয়ার দিনগুলো
যাত্রা শুরুর দিন থেকেই নিউমার্কেট ছিল জমজমাট। পোশাক, প্রসাধনী, গৃহসজ্জা, ইলেকট্রনিক্স, মনিহারি, ঘড়ি, জুতো, খাবার – কী ছিল না সেখানে! দেশভাগের পর চট্টগ্রামে পরিচিতি পাওয়া ওয়াদুদ মালাবার স্টোরস, লাকি স্টোরস, সিটি স্টোরস, মজুমদার ব্রাদার্স, চন্দ স্টোরসের মতো বিখ্যাত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিউমার্কেটে তাদের শাখা খোলে। ‘বিপণী বিতান মার্চেন্ট ওয়েলফেয়ার কমিটি’র বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ সাগির স্মৃতিচারণ করেন, “আমাদের মূল ব্যবসা ছিল স্টেশন রোডে, ওয়াদুদ ব্রাদার্স ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। মার্কেট চালু হলে বাবা এখানে শাড়ির দোকান নেন। একইভাবে লাকি কর্নার, দানু মিয়া অ্যান্ড সন্স, কানুনগো ওয়াচ, ভিক্টর ইলেকট্রনিক, রেডিও ভিশন – সবাই এখানে আসেন। শুরু থেকেই মার্কেট ছিল জমজমাট।”
নিচতলা ছিল মূলত শাড়ি, কাপড় আর গৃহস্থালি পণ্যের দখলে। দোতলায় শোভা পেত স্বর্ণালঙ্কার, ঘড়ি, স্টেশনারি আর টেইলার্সের দোকান। তৃতীয় তলা ছিল জুতো, ব্যাগ আর কাপড়ের জন্য। আর চতুর্থ তলা পরিচিতি পেয়েছিল ইলেকট্রনিক্স মার্কেট হিসেবে, সাথে ছিল একটি মসজিদও।
হারিয়ে যাওয়া সুর ও স্বাদেরা
সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলেছে। কিছু আইকনিক দোকান হারিয়ে গেছে, কিছু বদলেছে রূপ। যেমন, দোতলার একমাত্র রেস্তোরাঁ ‘ডায়মন্ড’। সিটি কলেজের কাছের এই রেস্তোরাঁটি ছিল তরুণদের প্রিয় আড্ডাস্থল। কাটলেট, চপ আর চায়ের স্বাদ এখনো লেগে আছে অনেকের স্মৃতিতে। ঈদের ছুটিতে বা পড়ন্ত বিকেলে এখানে বসতো বন্ধুত্বের আসর। কিন্তু কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে যায় সেই প্রিয় ডায়মন্ড, হারিয়ে যায় পাশের পানের দোকানটিও।
একইভাবে হারিয়ে গেছে চতুর্থ তলার গানের ক্যাসেটের দোকান ‘ঐকতান’। কলের গানের রেকর্ড থেকে শুরু করে স্টিরিও ক্যাসেটের যুগে তরুণ-তরুণীদের ভিড় লেগে থাকতো নতুন অ্যালবাম বা শিল্পীর গানের খোঁজে। প্রযুক্তির পরিবর্তনে সেই ক্যাসেটের যুগ শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে ঐকতানও। স্মৃতি হয়ে গেছে নিচতলা আর দোতলার অর্চিস গ্যালারি বা আজাদ প্রোডাক্টসের মতো গ্রিটিংস কার্ডের দোকানগুলোও।
ঐতিহ্যের ধারক যারা
তবে সব ঐতিহ্য হারিয়ে যায়নি। নিচতলার ‘রেভলন’ যেন তারুণ্যের স্টাইল আর ফ্যাশনের প্রতিচ্ছবি হয়ে আজও টিকে আছে। সত্তরের দশকে বাবার টেইলার্সের দোকানকে ধীরে ধীরে আধুনিক ফ্যাশন স্টোরে রূপান্তরিত করেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই হকার্স মার্কেটের বিদেশি পোশাকের প্রতি আকৃষ্ট জাহাঙ্গীর একসময় নিজেই আমদানি শুরু করেন। তিনি নস্টালজিক হয়ে বলেন, “এখনো পুরোনো অনেকে আসেন, তাদের ছেলে বা নাতিকে নিয়ে। দেখান, এখান থেকেই তারা একসময় স্টাইল করতেন।”
আরেক আইকনিক নাম ‘লিবার্টি’। নিউমার্কেটে গিয়ে লিবার্টির ফালুদা খায়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। দোতলার সেই ‘নিউ লিবার্টি ড্রিংক হাউস’ আজও ধরে রেখেছে তার স্বাদ আর ঐতিহ্য। পুরোনো কর্মী আবদুল হক জানান, একসময় সিঙ্গেল ডিজিটে ফালুদা বিক্রি হলেও এখন দাম ১৩০ টাকা। তবে কদর কমেনি একটুও।
‘কানুনগো অ্যান্ড সন্স’ ঘড়ির দোকানটিও ইতিহাসের সাক্ষী। ১৯৬২ সালে সদরঘাটে যাত্রা শুরু করে নিউমার্কেট প্রতিষ্ঠাকালে এখানেও শাখা খোলে। পরবর্তীতে ব্যবসা ভাগ হয়ে এখন এই মার্কেটেই কানুনগো নামে তিনটি দোকান রয়েছে, জানালেন সুবীর কানুনগো। শুরুর দিকের ‘লাকি কর্নার’ এখন হয়েছে ‘হ্যান্ডি বাজার’।
বদলে যাওয়া সময়ের স্রোতে
সময়ের পরিক্রমায় নিউমার্কেটের ব্যবসায়িক ধরনে পরিবর্তন এসেছে। মার্কেটের পরিধি বাড়াতে বি-ব্লক যুক্ত হলেও তা এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য নতুন ও আধুনিক শপিং মল। স্বাভাবিকভাবেই কমেছে নিউমার্কেটের উপর একক নির্ভরতা। সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম স্বীকার করেন, “আগে জেলা-উপজেলা থেকেও ক্রেতা আসতেন। এখন শহরে ও উপজেলায় অনেক মার্কেট হয়েছে। ক্রেতায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।”
তবুও নিউমার্কেট তার আবেদন হারায়নি। ব্যবসায়ীরা মনে করেন, ঐতিহ্যের একটা আলাদা শক্তি আছে। ঈদের আগে এখনো রাতভর কেনাকাটায় মুখর থাকে এই বিপণী বিতান। এটি শুধু একটি মার্কেট নয়, এটি চট্টগ্রামের বেড়ে ওঠার সাক্ষী, প্রজন্মের পর প্রজন্মের স্মৃতিবিজড়িত এক নস্টালজিয়ার নাম। শহরের প্রথম আধুনিক বিপণিকেন্দ্র হিসেবে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আজও অমলিন।