সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

সাত হাজার কুকুরের দ্বীপে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ ‘অপারেশন’

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

বঙ্গোপসাগরের অনন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের বিপন্ন সামুদ্রিক কাছিমসহ সার্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দ্বীপে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০০০ কুকুরকে বন্ধ্যাকরণের একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই পদক্ষেপটি দ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং বিশেষত ডিম পাড়তে আসা কাছিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যমতে, প্রায় ১০,৭০০ জন মানুষের বসতির এই দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই বেওয়ারিশ। কুকুরের এই অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যাবৃদ্ধি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, কোনো একটি প্রজাতির অত্যধিক সংখ্যাবৃদ্ধি প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত করে।

বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, বাংলাদেশে পাওয়া যাওয়া পাঁচ প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের মধ্যে সেন্ট মার্টিন এলাকায় সর্বাধিক দেখা যাওয়া ‘জলপাইরঙা বা অলিভ রিডলে’ কাছিম, যা আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) কর্তৃক লাল তালিকাভুক্ত অর্থাৎ বিপন্ন প্রজাতি। দ্বীপের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো এই বিপন্ন কাছিমের ডিম খেয়ে ফেলার পাশাপাশি ডিম পাড়তে আসা মা কাছিমদেরও আক্রমণ করে।

দেশের প্রচলিত প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, মালিকবিহীন প্রাণী নির্বিচারে নিধন বা অপসারণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে মানবিক ও কার্যকর উপায় হিসেবে বন্ধ্যাকরণকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা ‘অভয়ারণ্য’। গতকাল (সোমবার) অভয়ারণ্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল সেন্ট মার্টিনে পৌঁছেছে, যাদের মধ্যে বিদেশি পশুচিকিৎসকও রয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকেই কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও জানান, জানুয়ারিতে অভয়ারণ্যের কর্মীরা দ্বীপে জরিপ চালিয়ে কুকুরের সংখ্যা ও অবস্থা নিরূপণ করেন। বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি কুকুরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার কুকুরকে বন্ধ্যাকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগামী ২৭ এপ্রিলের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে আরও দুই ধাপে মোট ৩ হাজার কুকুরকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ভেটেরিনারি সার্ভিস (ডব্লিউভিএস)’ কারিগরি ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করছে। উল্লেখ্য, অভয়ারণ্য ২০১২ সাল থেকে রাজধানী ঢাকাতেও কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ করে আসছে।

অভয়ারণ্যের চেয়ারম্যান রুবাইয়া আহমদ জানান, জরিপে দেখা গেছে দ্বীপের প্রায় প্রতিটি ঘরে ৪-৫টি কুকুর রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এপ্রিল মাসে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস থাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, যা টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে যাতায়াত ও সরঞ্জাম পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি করবে।

বন্ধ্যাকরণের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে কুকুর লালন-পালন, সরকারি আইন এবং বন্ধ্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজও করা হবে বলে তিনি জানান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

সাত হাজার কুকুরের দ্বীপে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ ‘অপারেশন’

নিজস্ব প্রতিবেদক
৮ এপ্রিল ২০২৫, ১১:১৪

বঙ্গোপসাগরের অনন্য প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের বিপন্ন সামুদ্রিক কাছিমসহ সার্বিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। দ্বীপে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়া বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০০০ কুকুরকে বন্ধ্যাকরণের একটি বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই পদক্ষেপটি দ্বীপের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং বিশেষত ডিম পাড়তে আসা কাছিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যমতে, প্রায় ১০,৭০০ জন মানুষের বসতির এই দ্বীপে কুকুরের সংখ্যা বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই বেওয়ারিশ। কুকুরের এই অনিয়ন্ত্রিত সংখ্যাবৃদ্ধি দ্বীপের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, কোনো একটি প্রজাতির অত্যধিক সংখ্যাবৃদ্ধি প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত করে।

বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো, বাংলাদেশে পাওয়া যাওয়া পাঁচ প্রজাতির সামুদ্রিক কাছিমের মধ্যে সেন্ট মার্টিন এলাকায় সর্বাধিক দেখা যাওয়া ‘জলপাইরঙা বা অলিভ রিডলে’ কাছিম, যা আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন) কর্তৃক লাল তালিকাভুক্ত অর্থাৎ বিপন্ন প্রজাতি। দ্বীপের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো এই বিপন্ন কাছিমের ডিম খেয়ে ফেলার পাশাপাশি ডিম পাড়তে আসা মা কাছিমদেরও আক্রমণ করে।

দেশের প্রচলিত প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, মালিকবিহীন প্রাণী নির্বিচারে নিধন বা অপসারণ দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে মানবিক ও কার্যকর উপায় হিসেবে বন্ধ্যাকরণকেই বেছে নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি সংস্থা ‘অভয়ারণ্য’। গতকাল (সোমবার) অভয়ারণ্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল সেন্ট মার্টিনে পৌঁছেছে, যাদের মধ্যে বিদেশি পশুচিকিৎসকও রয়েছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের উপপরিচালক মো. জমির উদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকেই কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও জানান, জানুয়ারিতে অভয়ারণ্যের কর্মীরা দ্বীপে জরিপ চালিয়ে কুকুরের সংখ্যা ও অবস্থা নিরূপণ করেন। বর্তমানে ৭ হাজারের বেশি কুকুরের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার কুকুরকে বন্ধ্যাকরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগামী ২৭ এপ্রিলের মধ্যে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে আরও দুই ধাপে মোট ৩ হাজার কুকুরকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। এই উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ভেটেরিনারি সার্ভিস (ডব্লিউভিএস)’ কারিগরি ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করছে। উল্লেখ্য, অভয়ারণ্য ২০১২ সাল থেকে রাজধানী ঢাকাতেও কুকুর বন্ধ্যাকরণের কাজ করে আসছে।

অভয়ারণ্যের চেয়ারম্যান রুবাইয়া আহমদ জানান, জরিপে দেখা গেছে দ্বীপের প্রায় প্রতিটি ঘরে ৪-৫টি কুকুর রয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এপ্রিল মাসে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য নিম্নচাপ ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস থাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে, যা টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে যাতায়াত ও সরঞ্জাম পরিবহনে ঝুঁকি তৈরি করবে।

বন্ধ্যাকরণের পাশাপাশি স্থানীয়দের মধ্যে কুকুর লালন-পালন, সরকারি আইন এবং বন্ধ্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরির কাজও করা হবে বলে তিনি জানান।