মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে জোড়া খুন: হত্যার আগে ৪ ঘণ্টা বৈঠক, নেপথ্যে সাজ্জাদের ডানহাত হাসান

তরিকুল হাসান

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের ঘটনার পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের হাতে। হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগে দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে একটি গোপন বৈঠক করেছিল হামলাকারীরা। নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার ওয়াজেদিয়া কয়লার ঘর এলাকায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন কারাগারে থাকা ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেনের অন্যতম প্রধান সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ হাসান। এই তথ্য প্রকাশ পেয়েছে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মোহাম্মদ সজীবের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে।

সোমবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তফার আদালতে সজীব এই জবানবন্দি দেন। এর আগে রবিবার রাতে সদরঘাট এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।

আদালত সূত্রে প্রাপ্ত সজীবের জবানবন্দি অনুযায়ী, সাজ্জাদের ডানহাত হাসানই এই খুনের মূল পরিকল্পনাকারী। হাসান প্রথমে ইমন নামের একজনকে পরিকল্পনার কথা জানান। এই ইমন আগে থেকেই সজীবের পরিচিত ছিলেন এবং তারা দুজন বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি মামলায় একসাথেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ঘটনার দিন সকালে ইমন ফোন করে সজীবকে ফটিকছড়ি থেকে একটি মোটরসাইকেল নিয়ে শহরে আসতে বলেন। সজীব এক হাজার টাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া করে সন্ধ্যায় নগরের অক্সিজেন মোড়ে এসে ইমনকে ফোন দিলে তাকে কয়লার ঘর এলাকায় যেতে বলা হয়।

সেখানে গিয়ে সজীব হাসানসহ আরও সাত-আটজনকে দেখতে পান। জবানবন্দিতে সজীব বলেন, সেখানেই সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত তারা বৈঠক করেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সাজ্জাদের প্রতিপক্ষ সরোয়ার হোসেনকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া। বৈঠকে হাসান বিস্তারিত পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেন। সাজ্জাদকে ধরিয়ে দেওয়ার পেছনে সরোয়ারের হাত আছে, এমন ধারণা থেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা শেষে রাত ১২টার পর তারা কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন বালুমহাল এলাকায় যান।

সজীব আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের সময় তার চালানো মোটরসাইকেলেই অস্ত্র হাতে বসেছিলেন মূল পরিকল্পনাকারী হাসান। মোট সাতটি মোটরসাইকেলে করে সাত থেকে আটজন অস্ত্রধারী সরাসরি এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়, যাদের অনেককেই সজীব চেনেন না বলে দাবি করেছেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোজাম্মেল হক জানান, গ্রেপ্তারকৃত আসামি সজীবের জবানবন্দি থেকে হত্যাকাণ্ডের আগে অক্সিজেন এলাকায় হাসানের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীদের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং জড়িত কয়েকজনের নামও জানা গেছে। সজীবসহ মোট তিনজনকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাসান এবং পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৩০শে মার্চ রাতে একটি রুপালি রঙের প্রাইভেট কার শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বাকলিয়া এক্সেস রোডের দিকে যাওয়ার সময় একাধিক মোটরসাইকেল থেকে গাড়িটিকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। প্রাইভেট কারের ভেতর থেকেও পাল্টা গুলি ছোড়া হয়েছিল। এই ঘটনায় গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া গাড়িতে থাকা বখতিয়ার হোসেন (৩০) ও মো. আবদুল্লাহ (৩২) নিহত হন। তারা ‘সন্ত্রাসী’ সরোয়ার হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গাড়িতে সরোয়ার নিজেও ছিলেন, তবে তিনি ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।

নিহত বখতিয়ারের মা ফিরোজা বেগম বাদী হয়ে বাকলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় দুই ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ও সরোয়ার হোসেনের মধ্যকার পুরনো বিরোধকেই এই জোড়া খুনের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় সাজ্জাদ হোসেন ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। এছাড়া নাম উল্লেখ করা অন্য আসামিরা হলেন মো. হাছান, মোবারক হোসেন, মো. খোরশেদ, মো. রায়হান ও মো. বোরহান, যারা সবাই সাজ্জাদের অনুসারী। সাজ্জাদ বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।

পাঠকপ্রিয়