সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কেইপিজেডের বিস্ময়কর উত্থান: পরিবেশবান্ধব জোনে ৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি, ৭০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্য

যেভাবে বিদেশী বিনিয়োগের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে কেইপিজেড

নিজস্ব প্রতিবেদক

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে স্থাপিত কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) বাংলাদেশের শিল্পায়নে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। যাত্রা শুরুর পর থেকে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার পণ্য (মূলত জুতা ও পোশাক) রপ্তানি করে এই জোন দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সম্প্রতি এর প্রতিষ্ঠাতা এবং ইয়ংওয়ান কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান কিহাক সাংকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক সম্মানসূচক নাগরিকত্ব প্রদান করায় এখানে বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৮০ সালে কিহাক সাং বাংলাদেশে আসেন এবং ইয়াংওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তারই উদ্যোগে চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলায় ২ হাজার ৪৯২ একর জমির উপর ১৯৯৯ সালে কেইপিজেড প্রকল্পের উদ্বোধন হয় এবং ২০১১ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক উৎপাদন শুরু হয়। ৭৮ বছর বয়সী কিহাক সাং তার জীবনের ৪৫ বছর বাংলাদেশের শিল্পায়নের সাথে জড়িত। কেইপিজেড সূত্রমতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই জোন প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা) মূল্যের পণ্য রপ্তানি করেছে। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে রপ্তানিতে ঈর্ষণীয় প্রবৃদ্ধি লাভ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। পর পর তিন বছর ইয়ংওয়ান ও কেইপিজেড রপ্তানিতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

বর্তমানে কেইপিজেডে ইয়ংওয়ানের নিজস্ব ৪৮টি শিল্প কারখানার পাশাপাশি আমেরিকা ও জার্মানির তিনটি কারখানা চালু রয়েছে, যেখানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার। আমেরিকাভিত্তিক এমেরিকান এফার্ড সুতা এবং পেঙার বাংলাদেশ এক্সেসরিজ উৎপাদন করছে, অন্যদিকে জার্মানভিত্তিক এনজেল বার্ড গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগ করেছে। অবকাঠামোগত সুবিধা, তুলনামূলক কম মজুরি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের কারণে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা কেইপিজেডের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। সামনের দিনগুলোতে, বিশেষ করে আইটি খাতে, বড় বিনিয়োগের আশা করছে কর্তৃপক্ষ।

বর্তমানে কেইপিজেডে প্রায় ৩৫ হাজার কর্মী কর্মরত আছেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে চলমান কারখানাগুলো পূর্ণ উৎপাদনে গেলে এই সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে ৭০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

কেইপিজেড একটি পরিবেশবান্ধব শিল্প এলাকা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। মোট ২,৪৯২ একর জমির মধ্যে প্রায় ৮২৩ একর সবুজায়ন এবং প্রায় পৌনে ৫০০ একর খোলা জায়গা হিসেবে রাখা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪০০ একর জায়গার উপর কারখানাগুলো স্থাপিত এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের জন্য আরও অন্তত ৪০০ একর জায়গা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কেইপিজেডের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর নিজস্ব ৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ১৬ মেগাওয়াট নিজেদের কারখানায় ব্যবহৃত হয় এবং বাকি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়, যা জোনটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে।

কেইপিজেডের প্রতিষ্ঠাতা কিহাক সাংকে সম্মানসূচক বাংলাদেশী নাগরিকত্ব প্রদান করায় বিনিয়োগের সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। এই স্বীকৃতিকে কেইপিজেড এবং ইয়ংওয়ানের হাজার হাজার কর্মী স্বাগত জানিয়েছেন। কেইপিজেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মুশফিকুর রহমান বলেন, “চেয়ারম্যান কিহাক সাং পুরো এলাকাটিকে স্বপ্নের মতো করে সাজিয়েছেন। বিনিয়োগবান্ধব সব সুবিধা এখানে রয়েছে এবং বিনিয়োগকারীরা সরেজমিনে দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, বন্দর সুবিধা, শ্রমিকের সহজলভ্যতা এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা কেইপিজেডের বাড়তি আকর্ষণ।

কোরিয়ান ইপিজেডের এই অভাবনীয় সাফল্য এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনা এটিকে বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতিষ্ঠাতা কিহাক সাং-এর দূরদৃষ্টি এবং বাংলাদেশ সরকারের সহায়তায় কেইপিজেড ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পাঠকপ্রিয়