সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কেইপিজেড থেকে বনাঞ্চলে সরে গেল আতঙ্ক ছড়ানো হাতির পাল, উদ্বেগও কাটেনি

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের মনে দীর্ঘদিনের আতঙ্ক ছড়িয়ে অবশেষে কোরিয়ান ইপিজেড (কেইপিজেড) এলাকা ছেড়ে বনাঞ্চলের দিকে পাড়ি জমিয়েছে আলোচিত সেই বন্য হাতির পালটি। গত কয়েকদিনে শঙ্খ নদী পার হয়ে চারটি হাতিই বাঁশখালীর বনাঞ্চলের দিকে চলে গেছে বলে নিশ্চিত করেছে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ। এই খবরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও, হাতিগুলো আবার লোকালয়ে ফিরে আসতে পারে এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বন কর্মকর্তারা।

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উপ বন সংরক্ষক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানিয়েছেন, গত চার দিনের মধ্যে তিনটি হাতি শঙ্খ নদী অতিক্রম করে। এর মধ্যে দুটি হাতি গত বৃহস্পতিবার এবং শেষ হাতিটি রোববার ভোরে নদী পার হয়ে বাঁশখালীর দিকে চলে যায়। পালের চতুর্থ হাতিটি আগেই এলাকা ত্যাগ করেছিল। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, কেইপিজেড এলাকায় মূলত দুটি পুরুষ ও দুটি মাদি প্রাপ্তবয়স্ক হাতি ছিল, যারা এখন সবাই এলাকা ছেড়েছে।

তবে, হাতিগুলো যেহেতু স্বেচ্ছায় তাদের দীর্ঘদিনের আবাসস্থল ছেড়েছে, তাই তারা যে আবার ফিরে আসবে না, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিত নন বন কর্মকর্তারা। জনাব নেওয়াজ বলেন, “তারা আবার ফিরে আসার চেষ্টা করবে। তবে যাতে সেগুলো এদিকে ফিরে না আসে আমরা সে চেষ্টাটা করছি।” এই লক্ষ্যে কেইপিজেড এলাকায় থাকা প্রশিক্ষিত এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমকে (ইআরটি) ইতিমধ্যে নদীর ওপারে বাঁশখালীতে পাঠানো হয়েছে। ইআরটি সদস্য এবং দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মচারীরা সম্মিলিতভাবে বাঁশখালীর পুকুরিয়া এলাকার জনসাধারণের সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং হাতিগুলো পুনরায় কেইপিজেডের দিকে আসতে চাইলে তাদের প্রতিরোধ করে বনাঞ্চলের দিকে ফেরত পাঠানোর জন্য কাজ করছেন।

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়ন এবং আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের প্রায় আড়াই হাজার একর পাহাড়ি জমিতে ২০০৬-২০০৭ সালের দিকে কোরিয়ান এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (কেইপিজেড) স্থাপিত হয়। দেয়াং পাহাড় সংলগ্ন এই এলাকায় ২০১২-১৩ সাল থেকে হাতির আনাগোনা বাড়তে থাকে, যা ২০১৮ সালের দিকে স্থায়ী রূপ নেয়, যখন চারটি হাতির একটি পাল এই এলাকাকে তাদের আবাসস্থল বানিয়ে নেয়।

এরপর থেকেই কর্ণফুলীর বড় উঠান এবং আনোয়ারার বৈরাগ, বারখাইন, বটতলী ও বারশত ইউনিয়নের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ধান ও কলা গাছসহ বিভিন্ন ফসলের খোঁজে প্রায় রাতেই লোকালয়ে হানা দিত হাতির পালটি, চালাত তাণ্ডব। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির পাশাপাশি গত কয়েক বছরে ঝরে গেছে বেশ কয়েকটি মূল্যবান প্রাণ। নারী-শিশুসহ বেশ কয়েকজন হাতির আক্রমণে নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শুধু গত সাত মাসেই ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। গত ২১ মার্চ রাতে কর্ণফুলী উপজেলার শাহ মীরপুর গ্রামে একটি বাড়িতে হানা দিয়ে একটি তিন মাস বয়সী শিশুকে শুঁড় দিয়ে আছড়ে ফেলে হত্যা করে হাতি। এর আগে গত বছরের ২৩ অক্টোবর, ১১ সেপ্টেম্বর, ২৩ সেপ্টেম্বর এবং ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর বিভিন্ন এলাকায় হাতির আক্রমণে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

এই দীর্ঘদিনের তাণ্ডব ও প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয় জনগণ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছিল। হাতিগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে তারা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ এবং স্মারকলিপি প্রদানের মতো কর্মসূচি পালন করে আসছিল। অতি সম্প্রতি গত ২২ ও ২৭ মার্চ কেইপিজেড গেটে আনোয়ারা-পিএবি সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।

বন কর্মকর্তারা বলছেন, হাতিগুলো মূলত পানির সহজলভ্যতার কারণেই কেইপিজেড এলাকায় অবস্থান করছিল, যদিও সেখানেও তাদের পর্যাপ্ত খাবার সংকট ছিল। জনাব নেওয়াজ উল্লেখ করেন, বাঁশখালী ও চুনতির মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত জলাধারের অভাব রয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর আয়তনের বিশাল এই বনাঞ্চলে মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি জলাধার আছে, যেখানে প্রয়োজন অন্তত ৩০টির। তিনি মনে করেন, বনাঞ্চলে পর্যাপ্ত জলাধার থাকলে হাতিগুলো লোকালয়ের দিকে, বিশেষ করে কেইপিজেড এলাকায় আসত না।

আপাতত হাতির পালটি সরে যাওয়ায় আনোয়ারা ও কর্ণফুলীর সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, বন বিভাগের নজরদারি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয় এবং হাতিগুলো স্থায়ীভাবে বনাঞ্চলে থেকে যায় কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

পাঠকপ্রিয়