সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

প্রথা ভাঙল অন্তর্বর্তী সরকার: ইতিহাসে প্রথমবার কমছে বাজেট, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জোর

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির মুখে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য কিছুটা সংকুচিত বাজেটের পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। চলতি অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সাধারণত প্রতি বছর বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় বাড়ানো হলেও এবারই প্রথম এই প্রথা ভাঙা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। একইসঙ্গে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল ও বাজেট ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত এক ভার্চুয়াল সভায় এই রূপরেখা উপস্থাপন করেন অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার। পরিকল্পনা উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জুম প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠিত এই সভায় যোগ দেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অর্থ সচিব উপস্থাপিত বাজেটের প্রস্তাবিত আকার নিয়ে উপস্থিত কেউ দ্বিমত পোষণ করেননি। তবে এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের অপেক্ষায় থাকবে, যা আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত। তারা বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা, বৈদেশিক মুদ্রাভিত্তিক ঋণ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে আসা, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে সরকারের সুদ পরিশোধের বোঝা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহে ধীরগতি। এই বাস্তবতায় একটি সক্ষমতাভিত্তিক বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন তারা।

জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মূলত তিনটি প্রধান কারণে বাজেটের আকার ছোট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে: রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমে আসা এবং বাজেটের কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়ন না হওয়া। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাস অতিবাহিত হলেও বাজেট বাস্তবায়নের হার মাত্র ৩৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা সন্তোষজনক নয়। অর্থবছর শেষে এই হার ৭০ শতাংশ অতিক্রম করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। এই হতাশাজনক বাস্তবায়ন হার এবং চলমান অর্থনৈতিক সংকট বিবেচনায় রেখেই আগামী বাজেটের আকার কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া, সরকারের ব্যয় সংকোচন নীতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকুচিত মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে ৬৩ লাখ ১৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৪ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হতে পারে ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কিছুটা বেশি। অন্যদিকে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরে এডিপির আকার রয়েছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, বিগত সরকারগুলো উন্নয়নের নামে উচ্চাভিলাষী বাজেট দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। বছর শেষে বাজেট সংশোধন করে আকার কমানো হলেও পরের বছর আবারও বড় বাজেট দেওয়া হতো। তিনি বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট দেওয়ার কথা বলে আসছি। এখনই সময় এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার একটি বাস্তবায়নযোগ্য, বাস্তবতার নিরিখে বাজেট তৈরি করবে। সেটি হবে ভিত্তি বাজেট, যেখানে আয়-ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র থাকবে।”

একই সুরে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, “এই মুহূর্তে পরিস্থিতির আলোকে সক্ষমতা অনুসারে বাজেট দেওয়া উচিত। এটি করতে পারলে বাজেটের আকার কমে আসবে। বাজেট যতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবে, ততটুকুই দেওয়া উচিত।” তিনি মনে করেন, প্রস্তাবিত আকারের চেয়েও বাজেট আরও কিছুটা ছোট হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতীতে অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় বাজেট প্রণয়নের পরামর্শ দেওয়া হলেও তা উপেক্ষা করা হয়েছে, যার ফলে বাজেটের সঙ্গে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক চিত্রের মিল পাওয়া যেত না। এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে একটি বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়নের উদ্যোগ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন তারা। এটি সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

পাঠকপ্রিয়