৩৭ বছর আগে ১৯৮৮ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ডুবে গিয়েছিল ‘এমভি লিটা’। দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জাহাজটি রয়ে গেছে সমুদ্রের গভীরে। শুধু লিটা নয়, চট্টগ্রাম বন্দর এলাকা এবং কর্ণফুলী চ্যানেলে এরকম অন্তত ১৯টি জাহাজ বিভিন্ন সময়ে ডুবে গিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে একই অবস্থায় পড়ে আছে, যা বন্দর ব্যবহারকারীদের কপালে ফেলেছে চিন্তার ভাঁজ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক (অক্টোবর ২০২৪) তালিকা অনুযায়ী, এই ১৯টি ডুবন্ত জাহাজের মধ্যে এমভি লিটা ছাড়াও রয়েছে ২০০২ সালে ডুবে যাওয়া বিআইডব্লিউটিসি-র জাহাজ ‘সি-১০৬৩’ এবং ২০০৫ সালে সলিল সমাধি ঘটা ‘এমভি ফরচুন’। এছাড়াও নাম জানা গেছে এমভি বেঙ্গল ব্রিজ, এমভি কাদের, এমভি সি মাস্টার-১, এমভি সি সম্রাট, এমভি বিশভা কুসুম, এমভি হ্যাঙ্গ গ্যাঙ্গ-৩, এমভি ফিরোজ ফারজানা, এমভি হ্যাঙ্গ রো বঙ, এমভি কাওয়ানা, এমভি ইউনাইটেড স্টার, এমভি এসএস থেটিক এবং এমভি সুমাইয়া সাজিদ এর। বাকি ৪টি জাহাজের নাম এখনো অজানা।
কোথায় কোথায় বিপদ ওঁৎ পেতে আছে?
সিনিয়র হাইড্রোগ্রাফার ঢালী মোহাম্মদ শোয়ায়েব নজীরের তালিকা বলছে, ৭টি ডুবন্ত জাহাজ বন্দরের আলফা অ্যাংকরেজে, ১টি ব্রাভো ও ১টি চার্লি অ্যাংকরেজে রয়েছে। বাকি ১০টির মধ্যে ৪টি পতেঙ্গা উপকূলের কাছে, ২টি পারকি সমুদ্রসৈকতের কাছে, ১টি প্রস্তাবিত বে টার্মিনাল প্রকল্প এলাকায়, ১টি কেইপিজেড জেটির কাছে এবং ২টি বহির্নোঙরের বাইরের অংশে ডুবে আছে। এছাড়াও বন্দর চ্যানেল থেকে হালদার মুখ পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ২২টি রেক (ডুবন্ত জাহাজ) চিহ্নিত আছে বলে জানিয়েছেন চিফ হাইড্রোগ্রাফার কমান্ডার মোহাম্মদ শামসিত তাবরীজ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের স্বস্তি বনাম ব্যবহারকারীদের শঙ্কা
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ডুবন্ত এই জাহাজগুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা আছে এবং সেখানে লাল পতাকা দিয়ে নাবিকদের সতর্ক করা হয়। চ্যানেলের ম্যাপেও এগুলো মার্কিং করা। অতীতে যেহেতু কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, তাই ভবিষ্যতেও তেমন কোনো ঝুঁকি নেই এবং বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে না বলে দাবি তাদের। ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফরিদুল আলম জানান, জাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এই মুহূর্তে কোনো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কিন্তু বন্দর ব্যবহারকারীরা কর্তৃপক্ষের এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। তারা এই ডুবন্ত জাহাজগুলোকে ‘টাইম বোমা’র সঙ্গে তুলনা করছেন। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ বলেন, “এখন হয়তো রেকগুলো এড়িয়ে জাহাজ চলাচল করছে, কিন্তু বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে জাহাজের আনাগোনা বাড়বে। তখন এই রেকগুলো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।” তিনি আরও বলেন, “কোনো তেলবাহী জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লাগলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে, যা সামাল দেওয়া কঠিন হবে। বন্দরের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং নিরাপদ নেভিগেশনের স্বার্থে এগুলো দ্রুত অপসারণ করা উচিত।”
তাদের মতে, বিশ্বের অন্য কোনো বন্দরে জাহাজডুবির পর তা এভাবে ফেলে রাখা হয় না। দ্রুত উদ্ধার (সেলভেজ) করা হয়। এটি বন্দরের সেলভেজ সক্ষমতার অভাবকেই নির্দেশ করে। পানগাঁও এক্সপ্রেসের মতো ছোট জাহাজ তুলতেই যেখানে বেগ পেতে হয়েছে, সেখানে বড় জাহাজ উদ্ধারে আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ নিজস্ব সেলভেজ টিমের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন তিনি।
অতীতে দুর্ঘটনা ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি
ব্যবহারকারীদের আশঙ্কা অমূলক নয়। ২০২১ সালের ১৩ই জুলাই হাতিয়ার কাছে ডুবে থাকা একটি জাহাজের সঙ্গে ধাক্কা লেগে ‘এমভি হ্যাং গ্যাং-১’ নামের একটি লাইটারেজ জাহাজ ডুবে যায়। একই বছর ১৮ই ডিসেম্বর মোংলা বন্দরের কাছে ডুবন্ত জাহাজের সঙ্গে ধাক্কায় একটি তেল ট্যাংকারের বালাচ ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্ণফুলী ও বঙ্গোপসাগরের তলদেশের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের এই রেকগুলো যেকোনো সময় একই রকম বিপদ ঘটাতে পারে। এছাড়াও, এসব ডুবন্ত জাহাজের কারণে পলি জমে ডুবো চর সৃষ্টি হচ্ছে, যা অপসারণে প্রতি বছর বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোটি কোটি টাকা ড্রেজিংয়ে ব্যয় করতে হচ্ছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত বছরই বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্ণফুলী চ্যানেল থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ সফলভাবে উত্তোলন করেছে। প্রশ্ন উঠছে, সেই সক্ষমতা থাকলে বহির্নোঙরের এই ১৯টি জাহাজ উত্তোলনে অনীহা কেন?
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এর নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা নিয়ে কোনো আপস কাম্য নয়। ডুবন্ত জাহাজগুলো আপাতদৃষ্টিতে শান্ত থাকলেও ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা দীর্ঘদিনের জন্য বন্দরকে অচল করে দিতে পারে। তাই, বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি মেনে নিয়ে দ্রুত এই ‘টাইম বোমা’ নিষ্ক্রিয় করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।