মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আয়নাঘর থেকে ফেরা: গুম, নির্যাতন আর বিচারহীনতার গল্প

বিবিসি

বহুল আলোচিত ‘আয়নাঘর’ – নামটা শুনলেই যেন গা শিউরে ওঠে। অভিযোগ দীর্ঘদিনের, এই বন্দিশালাগুলোতে চলত অমানুষিক নির্যাতন। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসহীন একেকটি কুঠুরিকে বানিয়ে ফেলা হয়েছিল জীবন্ত কবর। অভিযোগ রয়েছে, ভিন্ন রাজনৈতিক মত দমনের জন্য এখানে বৈদ্যুতিক শকসহ নানা উপায়ে চলত নির্মম নিপীড়ন। স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হতো ভিন্নমত আর স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে।

৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নতুন করে সামনে এসেছে এই আয়নাঘরের বিভীষিকা। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে এর ভেতরের অন্ধকার জগতের নানা তথ্য। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি এমনই ছয়জন বন্দির সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে, যারা দীর্ঘদিন এই গোপন কারাগারে কাটিয়েছেন দুঃসহ, মানবেতর জীবন। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব অভিজ্ঞতা।

বিবিসির প্রতিবেদনে আইনজীবী মীর আহমেদ বিন কাসেমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের খুব কাছেই এমনই একটি গোপন নির্যাতন কক্ষের সন্ধান পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গুমের শিকার হয়েও ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফেরা মীর কাসেমের স্মৃতিচারণার সূত্র ধরেই তদন্তকারী দল এই গোপন কারাগারটি খুঁজে পায়। দীর্ঘ আট বছর বন্দিদশায় মীর আহমেদের চোখ বেশিরভাগ সময়ই বাঁধা থাকত। সেই অবস্থায় তিনি কেবল কিছু শব্দ শুনতে পেতেন, যার মধ্যে ছিল বিমানের ওঠা-নামার শব্দ। এই সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা বিমানবন্দরের নিকটবর্তী একটি সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে মূল ভবনের পেছনে একটি ছোট, সুরক্ষিত, জানালাবিহীন ইট-কংক্রিটের কাঠামো খুঁজে পান তারা – যা ছিল বন্দিদের আটকে রাখার নরককুণ্ড।

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, ‘কারাগারটিতে নতুন ইট বাঁধানো একটি প্রবেশপথ দেখা যায়, যা ভেতরের বীভৎসতাকে আড়াল করার একটি চেষ্টা মাত্র। ভেতরে ঢুকতেই সরু করিডোর, ডানে-বাঁয়ে ছোট ছোট কুঠুরি। চারপাশ নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা।’ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এই গোপন কারাগারগুলো পরিচালনাকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ ইউনিট র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

সাত মাস আগে মুক্তি পাওয়া আহমেদ বিন কাসেম বিবিসিকে বলেন, ‘আমার মনে হতো, আমাকে জীবন্ত কবর দেওয়া হয়েছে। বাইরের দুনিয়া থেকে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।’ তিনি জানান, তার কক্ষে আলো ঢোকার কোনো পথ ছিল না, দিন আর রাতের তফাৎ বোঝার উপায় ছিল না তার। প্রতিবেদনে তার কক্ষটির বর্ণনায় বলা হয়, ‘টর্চলাইটের আলোয় দেখা গেল, কুঠুরিটি এতই ছোট যে একজন স্বাভাবিক মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। ভেতর থেকে ভেসে আসছে ভ্যাপসা দুর্গন্ধ। কিছু দেয়াল ভাঙা, ইট-কংক্রিটের টুকরো ছড়িয়ে আছে মেঝেতে – অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলার শেষ চেষ্টা স্পষ্ট।’

আয়নাঘর
আয়নাঘর

বিবিসির সাথে কথা বলা আরও পাঁচজন ভুক্তভোগী জানিয়েছেন একই রকম ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। তাদেরও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল কংক্রিটের অন্ধকার কুঠুরিতে। বাইরে বের হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রায় সবাইকেই সহ্য করতে হয়েছে মারধর ও নির্যাতন।

৩৫ বছর বয়সী আতিকুর রহমান রাসেল জানান, গত জুলাইয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলার সময় পুরান ঢাকার এক মসজিদের সামনে থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। কোথায় রাখা হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জানার কোনো উপায়ই ছিল না।’ তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আটককেন্দ্র পরিদর্শনের খবর দেখে তার ধারণা হয়, তাকে হয়তো ঢাকার আগারগাঁও এলাকার কোনো কেন্দ্রে রাখা হয়েছিল।

অবাক করার বিষয় হলো, ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় বন্দি থাকলেও প্রায় সব ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতার বর্ণনাই একই রকম।

৭১ বছর বয়সী ইকবাল চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল, ‘যদি কখনও মুখ খোলেন কোথায় ছিলেন বা কী ঘটেছিল তা নিয়ে, তবে আপনাকে আবার তুলে নেওয়া হবে এবং কেউ আর খুঁজে পাবে না। আপনি দুনিয়া থেকে গায়েব হয়ে যাবেন।’ নিজের ওপর হওয়া নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়েছে, মারধর করা হয়েছে। শকের কারণে একটি আঙুল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। পায়ের জোর, শরীরের শক্তি দুটোই কমে গেছে। আমি এখনও আতঙ্কে থাকি।’

২৩ বছরের রহমতুল্লাহর চোখেমুখেও স্পষ্ট আতঙ্ক। তিনি বলেন, ‘ওরা আমার জীবন থেকে দেড়টা বছর কেড়ে নিয়েছে। সেই সময়টা আমি আর কখনও ফিরে পাব না। ওরা আমাকে এমন এক জায়গায় রেখেছিল, যেখানে কোনো মানুষ থাকতে পারে না।’

বিবিসি আরও দুজন সাবেক বন্দি, মাইকেল চাকমা ও মাসরুর আনোয়ারের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যেও উঠে এসেছে এই গোপন বন্দিশালাগুলোর ভেতরের অমানবিক চিত্র।

একটি বেসরকারি সংস্থার হিসেব অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৭০৯ জন গুম হয়েছেন, যার মধ্যে ১৫৫ জন এখনও নিখোঁজ। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিশনের কাছে এ পর্যন্ত ১,৬৭৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে এবং এই সংখ্যা বাড়ছেই। তবে ধারণা করা হয়, গুমের প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এইসব গোপন কক্ষে নির্যাতনের অভিযোগে এখন পর্যন্ত ১২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও, কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

গোপন কারাগার পরিদর্শনে যাওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বিবিসিকে বলেছেন, ‘বিচার সম্ভব এবং একদিন তা হবেই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রুখতে হবে। ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, কারণ তারা অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘এটি বন্দিশালাগুলোর একটি মাত্র। দেশজুড়ে আমরা এমন ৫০০, ৬০০, ৭০০-এর বেশি সেলের সন্ধান পেয়েছি। এতেই বোঝা যায়, এই গোপন কারা নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত ও পরিকল্পিত ছিল।’

পাঠকপ্রিয়