আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দামে স্বস্তি ফিরলেও তার কোনো প্রভাব নেই বাংলাদেশের বাজারে, বরং এখানে চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ববাজারে পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের দাম ধারাবাহিকভাবে কমছে, কিন্তু দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে এই দুটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কেবল বেড়েই চলেছে। এই বিপরীতমুখী প্রবণতার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা সরকারের দেওয়া শুল্ক-কর সুবিধা প্রত্যাহার হওয়াকে চিহ্নিত করেছেন।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৭ মার্চ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন মালয়েশিয়ান পাম অয়েল ৪ হাজার ৫৮৩ রিংগিতে বিক্রি হয়েছিল। এর ঠিক এক মাস পর, গত ১৬ এপ্রিল, একই পাম অয়েল বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ১৩ রিংগিতে। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে টনপ্রতি দাম কমেছে ৫৭০ রিংগিত, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫ হাজার ৭০০ টাকা। লিটারের হিসাবে এই দাম কমার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৫ টাকা।
ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য অনুযায়ী, এই দরপতনের ধারা বেশ স্পষ্ট। গত ২ এপ্রিল প্রতি মেট্রিক টন মালয়েশিয়ান পাম অয়েল ৪ হাজার ৫১৫ রিংগিতে (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৩৬ টাকা বা প্রতি লিটার ১২৪.৩৩ টাকা) বিক্রি হয়েছিল। কিন্তু দাম কমতে কমতে গত ১৬ এপ্রিল তা ৪ হাজার ১৩ রিংগিতে (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ৫১১ টাকা বা প্রতি লিটার ১১০.৫১ টাকা) নেমে আসে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থা বিরাজ করছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। এখানে গত ২০ দিনের ব্যবধানেই টনপ্রতি পাম অয়েলের দাম বেড়েছে অন্তত ৯ হাজার ৩০০ টাকা। গত ২৭ মার্চ খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ (৩৭.৩৩ কেজি) পাম অয়েল ৫ হাজার ৪২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, যা ১৬ এপ্রিল ৫ হাজার ৭৭০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ, এই কম সময়ের মধ্যেই পাইকারি বাজারে লিটারপ্রতি পাম অয়েলের দাম প্রায় ৯ টাকা বেড়ে গেছে। বর্তমানে খাতুনগঞ্জে প্রতি লিটার পাম অয়েল পাইকারিতে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
একই রকম বৈপরীত্য দেখা গেছে সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন সয়াবিন তেল ১ হাজার ৩৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হলেও, গত ৭ এপ্রিল তা ৯৭৬ ডলারে নেমে আসে। প্রায় দেড় মাসের এই ব্যবধানে টনপ্রতি দাম কমেছে ৫৯ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭ হাজার ১৯৮ টাকা, অর্থাৎ প্রতি লিটারে দাম কমেছে অন্তত ৭ টাকা।
ট্রেডিং ইকোনমিকসের তথ্য বলছে, ৪ ফেব্রুয়ারি প্রতি টন সয়াবিন তেল ১ হাজার ৭৬ ডলারে (লিটার প্রতি প্রায় ১৩১.২৭ টাকা) বিক্রি হলেও ৭ এপ্রিল তা ৯৭৬ ডলারে (লিটার প্রতি প্রায় ১১৯.০৭ টাকা) নেমে আসে। কিন্তু দেশের বাজারে ঘটেছে ঠিক উল্টোটা। খাতুনগঞ্জে গত ২৭ মার্চ প্রতি মণ (৩৭.৩৩ লিটার) সয়াবিন তেল ৫ হাজার ৮৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, যা বর্তমানে ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৬ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে মণপ্রতি দাম বেড়েছে প্রায় ৫২০ টাকা এবং লিটারপ্রতি দাম বেড়েছে অন্তত ১৩ টাকা।
দেশের বাজারে দাম বাড়ার এই প্রবণতার মুখে ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গত ১৫ এপ্রিল লিটারপ্রতি পাম অয়েলের দাম ১২ টাকা এবং সয়াবিন তেলের দাম ১৪ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। এর ফলে খুচরা বাজারে প্রতি লিটার পাম অয়েলের নতুন নির্ধারিত দাম হয় ১৬৯ টাকা। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, সরকার খুচরা মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়ার আগেই, অর্থাৎ গত ২৭ মার্চ থেকেই পাইকারি বাজারে দাম বাড়ছিল। এমনকি সরকারের ঘোষণার পর দাম কমার বদলে উল্টো বেড়েছে। দাম বাড়ানোর সরকারি ঘোষণার পরের দুই দিনেই খাতুনগঞ্জে মণপ্রতি সয়াবিন তেলের দাম আরও প্রায় ৩০০ টাকা বেড়ে যায়, যা লিটারে প্রায় ৮ টাকা বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার পরও দেশের বাজারে কেন দাম বাড়ছে, এই প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ভোজ্য তেল আমদানিতে সরকার এতদিন যে শুল্ক-কর ছাড় দিয়েছিল, তা গত ৩১ মার্চ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তেল আমদানিতে খরচ বেড়ে গেছে এবং সেই বর্ধিত খরচের প্রভাবই এখন বাজারে পড়ছে। উল্লেখ্য, এর আগে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সরকার গত ডিসেম্বর মাসে লিটারে ৮ টাকা দাম বাড়ালেও ব্যবসায়ীরা লোকসানের কথা বলে আসছিলেন। পরবর্তীতে দাম স্থিতিশীল রাখতে সরকার শুল্ক-করে ছাড় দেয়। গত বছরের ১৭ অক্টোবর ভোজ্য তেল আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং নভেম্বরে তা আরও কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছিল। এই সুবিধা ৩১ মার্চ পর্যন্ত বহাল থাকায় বাজারে দাম কিছুটা স্থিতিশীল ছিল।
কিন্তু এই সুবিধা বাতিল হওয়ার পরই মূলত দাম আবার বাড়তে শুরু করে এবং ব্যবসায়ীদের ক্রমাগত দাবির মুখে সরকার গত ১৫ এপ্রিল দাম বাড়াতে এক প্রকার বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার বিপরীতে অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোজ্য তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।