সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

সবুজ ধ্বংস করে শিল্পনগরী: মিরসরাইয়ে পরিবেশের কান্না শুনছে কে?

মিরসরাই ইকোনমিক জোন নিয়ে হাজারো প্রশ্ন, কোথায় ১৫ লাখ চাকরি?

তরিকুল হাসান

চট্টগ্রামের মিরসরাই ও ফেনীর সোনাগাজীর বিস্তীর্ণ উপকূল জুড়ে দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার যে বিশাল কর্মযজ্ঞ প্রায় এক যুগ আগে শুরু হয়েছিল, তা এখন নানা অভিযোগ আর গভীর অনিশ্চয়তায় জর্জরিত। প্রায় ৩৪ হাজার একর জমিতে শিল্প বিপ্লবের উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন নিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পটি বিনিয়োগ টানতে বা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি।

উল্টো, শিল্প স্থাপনের জন্য অপরিহার্য পানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারা এবং প্রায় ২২ হাজার একরের বেশি সংবেদনশীল উপকূলীয় বনভূমি উজাড় করে পরিবেশের উপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনার দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যেই এখন প্রশ্ন উঠছে, এই মেগা প্রকল্পটি লাভের চেয়ে দেশের ক্ষতিই বেশি করছে কিনা।

দেশের উত্তরাঞ্চলে ভূমির অপ্রতুলতার কারণে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক, চট্টগ্রাম বন্দর ও রাজধানীর সাথে সহজ যোগাযোগের সুবিধার কথা চিন্তা করে বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেল উপকূলবর্তী এই চর এলাকাকে বেছে নিয়েছিল বেজা। শুধু দেশি-বিদেশি বিপুল বিনিয়োগই নয়, নির্মাণাধীন রামগড় স্থলবন্দরের মাধ্যমে ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণও ছিল পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হওয়া সত্ত্বেও এক দশক ধরে এর বাস্তবায়ন চলছে ঢিমেতালে। এর প্রধান কারণ হিসেবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষ করে পানি সরবরাহের বিষয়টি গোড়া থেকেই বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। শুরুতে চট্টগ্রাম ওয়াসার মাধ্যমে হালদা নদী থেকে পানি আনার পরিকল্পনা করা হলেও দেশের মিঠা পানির মাছের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্র থেকে পানি উত্তোলনের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীদের তীব্র আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে ফেনী নদী বা মুহুরী প্রজেক্ট থেকে পানি আনার বিকল্প ভাবা হলেও সেই পরিকল্পনাও এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি, যা বিনিয়োগকারীদের চরম অনিশ্চয়তায় ফেলেছে।

বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (বিইজেডআইএ) সভাপতি এমএ জব্বার এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এ অঞ্চলটির পরিকল্পনার শুরুতেই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজটি যথাযথভাবে করা উচিত ছিল। পানি থেকে শুরু করে সব ধরনের বিনিয়োগ অবকাঠামো যাতে করে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। ওখানে বড় একটা সমস্যা হলো পানি।

এছাড়া বিদ্যুতের বিষয়ও রয়েছে। পিজিসিবি একটা সাবস্টেশন করেছে, কিন্তু শুধু সাবস্টেশন দিয়ে তো আর হবে না।’ তিনি আরও যোগ করেন, সড়কের প্রয়োজনীয়তা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বেজার নিজস্ব অর্থায়নের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। তার মতে, সম্ভাব্যতা যাচাই ঠিকমতো না হওয়াতেই পানির চাহিদার মতো বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। তিনি জানতে পেরেছেন, বেজার হালনাগাদ পরিকল্পনায় প্রকল্পটির কলেবরও কমিয়ে আনা হচ্ছে।

এই অর্থনৈতিক স্থবিরতার পাশাপাশি পরিবেশের উপর পড়েছে মারাত্মক খাঁড়া। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির যুক্তিতে ২২ হাজার ৩৩৫ একর সৃজিত ও প্রাকৃতিক বনভূমি বেজার হাতে তুলে দিয়েছিল বনবিভাগ। এই বনভূমি শুধু গেওয়া, কেওড়া, বাইন, হারগোজার মতো উপকূল রক্ষাকারী উদ্ভিদে সমৃদ্ধই ছিল না, ছিল হরিণ, শিয়াল, মেছোবাঘ, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ, সামুদ্রিক ও জলচর পাখিসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাস। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়নের নামে এরই মধ্যে কাটা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ গাছ।

বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, একসময় এই বনে দশ হাজারের বেশি হরিণ থাকলেও নির্বিচার বন ধ্বংস এবং নির্মাণ কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট উপদ্রবে এই সংখ্যা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। আবাস হারিয়ে হরিণগুলো প্রায়শই লোকালয়ে বা রাস্তায় চলে আসছে এবং যানবাহনের আঘাতে বা শিকারিদের হাতে মারা পড়ছে।

মিরসরাই উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল গফুর মোল্লা বলেন, ‘মিরসরাইয়ে অবস্থিত জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য দেয়া বনে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ছিল। বিভিন্ন বন্য প্রাণীর মধ্যে হরিণের সংখ্যাই ছিল বেশি। বনাঞ্চল কমে আসায় হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীও বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো নির্মাণ, বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে হরিণসহ অন্যান্য প্রাণিকুলের সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে গেছে।’

বন কর্মকর্তারা আরও জানাচ্ছেন, মিরসরাই থেকে ফেনী পর্যন্ত বিস্তৃত এই এলাকাটি বাংলাদেশের অন্যতম সংকীর্ণ অঞ্চল, যার একদিকে বঙ্গোপসাগর ও অন্যদিকে ভারত। তাই দেশের মূল ভূখণ্ড এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথের মতো লাইফলাইন অবকাঠামোকে সমুদ্রের ভাঙন থেকে রক্ষা করতে এই উপকূলীয় বনের গুরুত্ব অপরিসীম। বন উজাড়ের ফলে সেই সুরক্ষা বলয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বন বিভাগ বেজার অব্যবহৃত প্রায় ৪ হাজার ১০৪ একর জমি দ্রুত ফেরত চাইছে, যেখানে এখনো প্রাকৃতিক বন টিকে আছে এবং যা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চিঠি দিয়ে এই জমি ফেরত আনার অনুরোধ জানিয়েছেন, যাতে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য ফেরানো যায়। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমও এই বনভূমি রক্ষা ও নতুন বনায়নের জন্য একাধিক প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ এবং কেটে ফেলা গাছের বিকল্প হিসেবে সুপারডাইক ও খালের পাড়ে বনায়ন।

তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক স্বার্থে শিল্পাঞ্চল নির্মাণ করতে হবে এটা যেমন সত্য, তেমনি উপকূল কিংবা বনও রাখতে হবে। আমরা উপকূল রক্ষা, বন সৃজন করতে মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জমি ফেরত চেয়েছি। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে অব্যবহৃত জমিতে বন সৃজনের মাধ্যমে মিরসরাই-ফেনীর উপকূল সুরক্ষায় কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক শেখ আবুল কালাম আজাদ যোগ করেন, ‘মিরসরাইয়ের এ বনে হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণীর উপস্থিতি ছিল। এটি ইকোসিস্টেমের অংশ। …এখন বন কমে গেছে, হরিণও কমে গেছে। আমরা যদি এ বন রক্ষা করতে পারি, আবারো হরিণের বাসস্থান ফিরিয়ে আনতে পারব।’

অন্যদিকে, বেজা কর্তৃপক্ষ পরিবেশ বিপর্যয়ের ব্যাপক অভিযোগকে কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে মনে করছে। বেজার নির্বাহী সদস্য অতিরিক্ত সচিব সালেহ আহমদ বলেন, ‘প্রাণিকুল বিপন্নের বিষয়টি শুধু কথার কথা বলে আমি মনে করি। যতদূর শুনেছি কিছু বনবিড়াল, কাঠবিড়ালি ছিল, স্থানীয় কেউ কেউ বলেন কিছু হরিণও ছিল। মিরসরাইয়ে অনেক প্রাণিকুল বিপন্ন হয়েছে এবং ম্যানগ্রোভ নষ্ট হয়ে গেছে—এ ধরনের অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়।’ তার মতে, তারা পরিবেশ ধ্বংস করেননি, বরং কিছু পরিবর্তন এনেছেন, যাকে ‘বিনির্মাণ’ বলা যায় এবং বেজা নিজেও বনায়ন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন যে, নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পটির আকার কমিয়ে প্রায় ২১ হাজার একরে নামিয়ে আনা হচ্ছে এবং কিছু প্রস্তাবিত কৃষিজমি অধিগ্রহণ করা হবে না।

তার ভাষ্যমতে, ‘ভবন বা স্থাপনা নির্মাণে যে পরিমাণ পানি ও বিদ্যুৎ প্রয়োজন, তা আমরা এখনই দিতে পারব। আর উৎপাদন পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ও পানি সংস্থানের প্রস্তুতিও আমাদের রয়েছে।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, পুরো এলাকা মাটি ভরাট করতেই দুই থেকে আড়াই লাখ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা রাতারাতি সম্ভব নয়। বন বিভাগের জমি ফেরত চাওয়া প্রসঙ্গে সালেহ আহমদ জানান, চিঠি পেলেও জমিটি সরকারি এবং সেখানে ইতোমধ্যে উন্নয়ন কাজ ও লিজ প্রদান করা হয়েছে, তাই এটি ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।

এই পরিস্থিতিতে, দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার এক যুগ পর মিরসরাই প্রকল্পটি এক চরম অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। একদিকে যেমন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি, তেমনি অপরিহার্য সেবা নিশ্চিত করার ব্যর্থতা এবং ব্যাপক পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ প্রকল্পটির উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন না হওয়ায় এবং অরক্ষিত হয়ে পড়া উপকূলীয় বন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলায়, অর্থনৈতিক অগ্রগতির এই মডেল আদৌ টেকসই কিনা, সেই মৌলিক প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

পাঠকপ্রিয়