সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

২২ এপ্রিল জাপানি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে গতি, শুরু হচ্ছে জেটি নির্মাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের সমুদ্র বাণিজ্য খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে নির্মিতব্য মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের নির্মাণকাজ নতুন গতি পেতে যাচ্ছে। আগামী ২২ এপ্রিল জাপানি দুটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এই চুক্তির আওতায় প্রায় ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জেটি ও একটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হবে।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে নির্মিতব্য জেটি দুটির মধ্যে একটি হবে ৪৬০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার জেটি এবং অন্যটি ৩০০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস জেটি। এই দুটি জেটিতে একত্রে তিনটি বড় বা চারটি মাঝারি আকারের মাদার ভ্যাসেল ভিড়তে পারবে। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এই ধাপের পুরো অর্থায়ন করবে এবং জাপানি প্রতিষ্ঠান পেন্টা ওশান ও থোয়া করপোরেশন যৌথভাবে আগামী চার বছরের মধ্যে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করবে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, “আগামী ২২ এপ্রিল জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজের চুক্তি সম্পাদিত হবে। চুক্তি সম্পাদনের পরপরই মাতারবাড়িতে জেটি নির্মাণের কাজ শুরু হবে।”

মহেশখালীর মাতারবাড়িতে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) কর্তৃক ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়। এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানি ও যন্ত্রপাতি আনার সুবিধার্থে ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার প্রস্থ এবং ১৬ মিটার গভীরতার একটি চ্যানেল খনন করা হয়।

পরবর্তীতে, জাইকার প্রস্তাবে এই চ্যানেলটিকে আরও ১০০ মিটার প্রশস্ত (মোট ৩৫০ মিটার) এবং ২ মিটার গভীর (মোট ১৮ মিটার) করে এটিকে গভীর সমুদ্র বন্দরে রূপান্তরের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। ২০১৮ সালে ‘মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে এই কাজ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে।

কিন্তু নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি ও আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় প্রকল্পের ব্যয় কয়েক ধাপে বৃদ্ধি পায়। প্রথমে ব্যয় সংশোধন করে ১৭ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা করা হয়। পরবর্তীতে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা বেড়ে চূড়ান্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকায়। প্রকল্পের মেয়াদও বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে, যখন বন্দরটি পুরোদমে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্মিত চ্যানেল ও জেটি এবং এর নির্মাণ ব্যয়ের দায়ভার ইতোমধ্যে সিপিজিসিবিএল বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে।

মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। ১৮ মিটার গভীরতার এই বন্দরে ১৪ মিটার ড্রাফটের বিশালাকার জাহাজ (প্রায় ১ লাখ টন পণ্য বা ৮-১০ হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী) সহজেই ভিড়তে পারবে। ইতোমধ্যে সাড়ে ১২ মিটার ড্রাফটের একটি জাহাজ ৬৫ হাজার টনের বেশি কয়লা নিয়ে এই চ্যানেলে ভিড়েছে। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরতা না থাকায় দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা জাহাজ ভেড়ানোর সুবিধা পাওয়া যাবে, যা দেশের বর্তমান বন্দরগুলোর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তুলবে এবং পণ্য পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমাবে।

এক সমীক্ষায় ধারণা করা হচ্ছে, মাতারবাড়ি বন্দর ২০২৯ সালের মধ্যে বছরে ১১ লাখ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ২৬ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেনের পরিদর্শনের পর প্রকল্পের কার্যক্রমে আরও গতিশীলতা এসেছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এই চুক্তি স্বাক্ষর এবং জেটি নির্মাণকাজ শুরু হওয়াকে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর বাস্তবায়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাঠকপ্রিয়