বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য সাময়িকী ‘টাইম’ তাদের ২০২৫ সালের বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় ড. ইউনূসের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। বুধবার (১৭ এপ্রিল) প্রকাশিত এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় ‘লিডারস’ বা ‘নেতা’ ক্যাটাগরিতে ২২ জনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছেন।
এই উপলক্ষে টাইম ম্যাগাজিনে ড. ইউনূসকে নিয়ে একটি পরিচিতিমূলক নিবন্ধ লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। ক্লিনটন তার লেখায় ড. ইউনূসের দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রশংসা করেন এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মুখে পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর ড. ইউনূস গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
হিলারি ক্লিনটন গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কয়েক দশক আগে ক্ষুদ্রঋণ ধারণা প্রবর্তনের কথা স্মরণ করেন, যার মাধ্যমে ড. ইউনূস দেশের প্রান্তিকতম জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীদের (প্রায় ৯৭ শতাংশ সুবিধাভোগী) অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিপ্লব এনেছিলেন। ক্লিনটন জানান, আরকানসাসে গভর্নর বিল ক্লিনটনকে সহায়তার সময় ড. ইউনূসের সাথে তার প্রথম সাক্ষাৎ হয় এবং পরবর্তীতে তিনি নিজেও যুক্তরাষ্ট্রে একই ধরনের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি চালু করেন। তিনি বিশ্বজুড়ে ড. ইউনূসের কাজের অভাবনীয় প্রভাব প্রত্যক্ষ করার কথাও উল্লেখ করেন, যা অগণিত মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনেছে এবং সমাজে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমান ভূমিকা সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন লিখেছেন, “এখন ইউনূস আবার তার দেশের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশকে নিপীড়নের ছায়া থেকে বের করে আনতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছেন, জবাবদিহিতা আনছেন, এবং একটি মুক্ত ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের ভিত গড়ছেন।”
টাইমের এই বছরের প্রভাবশালী ‘লিডারস’ ক্যাটাগরিতে ড. ইউনূসের সাথে আরও রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাম, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। অন্যান্য ক্যাটাগরিতে প্রভাবশালী হিসেবে ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ ও টেনিস তারকা সেরেনা উইলিয়ামের মতো ব্যক্তিত্বদের নাম রয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগেও ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’ তাদের ২০২৪ সালের বর্ষসেরা দশ ব্যক্তির তালিকায় তাকে স্থান দিয়েছিল এবং ‘নেশনস বিল্ডার’ বা ‘জাতির কারিগর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। নেচার ম্যাগাজিনও তার বৈপ্লবিক অর্থনীতিবিদ থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। টাইম ম্যাগাজিনের এই স্বীকৃতি ড. ইউনূসের বৈশ্বিক প্রভাব এবং বাংলাদেশের বর্তমান ক্রান্তিকালে তার নেতৃত্বের গুরুত্বকেই পুনর্বার প্রতিষ্ঠিত করলো।