সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চবিতে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট স্টেশন, বঙ্গোপসাগর থাকবে সার্বক্ষণিক নজরে

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসে সক্ষমতা অর্জন এবং সমুদ্র গবেষণায় স্বনির্ভরতার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিল বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্থাপিত হচ্ছে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন বা ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। এই অত্যাধুনিক স্টেশনটি নির্মাণের ফলে সমুদ্র বিষয়ক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য বিদেশি উৎসের উপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। চবির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং চীনের স্বনামধন্য জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি’র (এসআইও) যৌথ উদ্যোগে এই স্টেশনটি নির্মিত হচ্ছে। প্রায় ৭০ কোটি টাকা বাজেটের এই প্রকল্পে চীন সরকার প্রায় ৬০ কোটি টাকার কারিগরি ও যন্ত্রাংশ সহায়তা প্রদান করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভূমি, প্রয়োজনীয় জনবল, নিরাপত্তা এবং গবেষণাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করছে।

এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, তাপমাত্রা, পানির রঙ, সমুদ্রস্রোত, বাতাসের গতি ও দিক, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রের জৈববৈচিত্র্য সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (প্যারামিটার) সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরও নির্ভুল পূর্বাভাস প্রদান সম্ভব হবে। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এই স্টেশন কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এতদিন এসকল তথ্যের জন্য মূলত ভারত, নাসা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর নির্ভর করতে হতো বাংলাদেশকে।

এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা ও সমন্বয়ক, চবির মেরিন সায়েন্সেস এন্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশে এ ধরণের স্টেশন থাকলেও বাংলাদেশে এতদিন ছিল না। ফলে সমুদ্র বিষয়ক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গবেষণা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন ছিল। ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর নীল অর্থনীতির বিকাশে সমুদ্রবিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু সমুদ্র পর্যবেক্ষণে সক্ষমতা না থাকায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম।”

তিনি আরও জানান, ২০১৯ সাল থেকে তিনি চীনের এসআইও কর্তৃপক্ষের সাথে এই স্টেশন স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, কারণ সমুদ্র গবেষণায় চীনের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ড. মোসলেম উদ্দিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “এই স্টেশন চালু হলে বঙ্গোপসাগরে আমাদের অংশে নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং সম্ভব হবে, যা সমুদ্র অর্থনীতি বিকাশে বাংলাদেশকে বহুদূর এগিয়ে নেবে। এখান থেকে প্রাপ্ত ডেটা প্রটোকল অনুযায়ী বিক্রি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারে এবং আমাদের গ্র্যাজুয়েট ও গবেষকরা দেশের সেবায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।”

সম্প্রতি স্টেশনটির নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন চবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আবহাওয়া ও সমুদ্র পূর্বাভাস ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হবে। এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাই বাড়াবে না, দেশের সমুদ্র অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম এই ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এর সফল বাস্তবায়ন সমুদ্রনির্ভর বাংলাদেশের জন্য অপার সম্ভাবনা উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চবিতে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট স্টেশন, বঙ্গোপসাগর থাকবে সার্বক্ষণিক নজরে

নিজস্ব প্রতিবেদক
১৯ এপ্রিল ২০২৫, ০৯:০৭

ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসে সক্ষমতা অর্জন এবং সমুদ্র গবেষণায় স্বনির্ভরতার পথে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিল বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) স্থাপিত হচ্ছে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন বা ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র। এই অত্যাধুনিক স্টেশনটি নির্মাণের ফলে সমুদ্র বিষয়ক তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য বিদেশি উৎসের উপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীল অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

গত ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। চবির সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং চীনের স্বনামধন্য জাতীয় সমুদ্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি’র (এসআইও) যৌথ উদ্যোগে এই স্টেশনটি নির্মিত হচ্ছে। প্রায় ৭০ কোটি টাকা বাজেটের এই প্রকল্পে চীন সরকার প্রায় ৬০ কোটি টাকার কারিগরি ও যন্ত্রাংশ সহায়তা প্রদান করছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভূমি, প্রয়োজনীয় জনবল, নিরাপত্তা এবং গবেষণাসহ আনুষঙ্গিক বিষয়গুলো নিশ্চিত করছে।

এই ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সরাসরি বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, তাপমাত্রা, পানির রঙ, সমুদ্রস্রোত, বাতাসের গতি ও দিক, লবণাক্ততা এবং সমুদ্রের জৈববৈচিত্র্য সম্পর্কিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য (প্যারামিটার) সংগ্রহ করবে। সংগৃহীত উপাত্ত প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরও নির্ভুল পূর্বাভাস প্রদান সম্ভব হবে। এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ, মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণ এবং বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় এই স্টেশন কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এতদিন এসকল তথ্যের জন্য মূলত ভারত, নাসা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার উপর নির্ভর করতে হতো বাংলাদেশকে।

এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা ও সমন্বয়ক, চবির মেরিন সায়েন্সেস এন্ড ফিশারিজ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, “ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশে এ ধরণের স্টেশন থাকলেও বাংলাদেশে এতদিন ছিল না। ফলে সমুদ্র বিষয়ক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গবেষণা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো কঠিন ছিল। ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর নীল অর্থনীতির বিকাশে সমুদ্রবিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা জরুরি হয়ে পড়ে। কিন্তু সমুদ্র পর্যবেক্ষণে সক্ষমতা না থাকায় আমরা পিছিয়ে ছিলাম।”

তিনি আরও জানান, ২০১৯ সাল থেকে তিনি চীনের এসআইও কর্তৃপক্ষের সাথে এই স্টেশন স্থাপনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, কারণ সমুদ্র গবেষণায় চীনের দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। ড. মোসলেম উদ্দিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “এই স্টেশন চালু হলে বঙ্গোপসাগরে আমাদের অংশে নিরবচ্ছিন্ন মনিটরিং সম্ভব হবে, যা সমুদ্র অর্থনীতি বিকাশে বাংলাদেশকে বহুদূর এগিয়ে নেবে। এখান থেকে প্রাপ্ত ডেটা প্রটোকল অনুযায়ী বিক্রি করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিকভাবেও লাভবান হতে পারে এবং আমাদের গ্র্যাজুয়েট ও গবেষকরা দেশের সেবায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।”

সম্প্রতি স্টেশনটির নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন চবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, “এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের আবহাওয়া ও সমুদ্র পূর্বাভাস ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হবে। এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাই বাড়াবে না, দেশের সমুদ্র অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে দেশের প্রথম এই ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপন নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। এর সফল বাস্তবায়ন সমুদ্রনির্ভর বাংলাদেশের জন্য অপার সম্ভাবনা উন্মোচন করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।