সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

কম উৎপাদনশীলতায় ঠকছেন চা শ্রমিকরা, মজুরি তলানিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক

চা উৎপাদনকারী অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শ্রীলঙ্কায় একজন চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি যেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচশ টাকা, কেনিয়া ও ভারতে যথাক্রমে ৪৮৩ ও ২৫৬ টাকা, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ১৭৯ টাকার কাছাকাছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূলত হেক্টরপ্রতি কম উৎপাদন এবং পুরোনো ক্লোনের কারণে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন খরচ বেশি, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রমিকদের মজুরিতে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ায় দেশের প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিকের জীবনযাত্রার মান তলানিতেই থেকে যাচ্ছে।

চা শ্রমিকরা জানান, কয়েক দফা আন্দোলনের পর ২০২২ সালে তাদের দৈনিক মজুরি ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মজুরি বেড়ে বর্তমানে তা ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। আগামী আগস্টে আরও ৫ শতাংশ বাড়ার কথা রয়েছে। দৈনিক মজুরির পাশাপাশি শ্রমিকরা প্রতি সপ্তাহে ভর্তুকি মূল্যে (প্রতি কেজি ২ টাকা) ৩ দশমিক ৩ কেজি আটা বা চাল পান। এছাড়া বাসস্থান, চিকিৎসা, রেশন, শিক্ষা ও বোনাসের মতো কিছু সুবিধা থাকলেও শ্রমিক নেতারা এগুলোকে অপ্রতুল বলছেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল বলেন, “একজন চা শ্রমিক দৈনিক যে মজুরি পান, তা খুবই নগণ্য। মালিকরা সবসময় দাম কম থাকার অজুহাতে মজুরি ও সুবিধা বাড়াতে চান না। কিন্তু উৎপাদিত চায়ের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দায় শ্রমিকের নয়। উৎপাদন খরচ কমিয়ে বাগানকে লাভজনক করার পাশাপাশি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে সরকারের কাজ করা উচিত।”

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, কম উৎপাদনশীলতার কারণে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন খরচ বেশি। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ হাজার কেজি/হেক্টর উৎপাদনশীল ক্লোন উদ্ভাবন করতে পেরেছে। অথচ ভারতে এর পরিমাণ ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার কেজি, কেনিয়ায় ৬ হাজার এবং শ্রীলঙ্কায় প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কেজি। এই কম উৎপাদনের কারণে খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবং নিলামে ভালো দাম না পাওয়ায় বাগান মালিকরা শ্রমিকের মজুরিতে কৃচ্ছ্রতা দেখাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সাবেক উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মুনির আহমেদ বলেন, “চায়ের মান বৃদ্ধি ও হেক্টরপ্রতি উৎপাদন খরচ কমাতে না পারলে বাগানগুলো শ্রমিককে বাড়তি মজুরি দিতে পারবে না। ভারত, শ্রীলংকা, কেনিয়া ভালো মানের চা উৎপাদন করে শ্রমিকদের বাড়তি মজুরি দিচ্ছে। আমাদের কেন ঘাটতি, তা নিয়ে গভীর অনুসন্ধান হচ্ছে না।” তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং চা বোর্ডকে ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দেন।

তবে বাংলাদেশী চা সংসদের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান শ্রমিকদের কম মজুরির বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, “উৎপাদন খরচ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, নিলামে দাম পাওয়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগ মালিক লোকসান দিচ্ছেন। দৈনিক মজুরির পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, রেশনসহ নানা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। সার্বিক হিসাব বিবেচনা করলে শ্রমিকরা আগের তুলনায় ভালো সুবিধা পাচ্ছেন।”

দেশে বর্তমানে ১৭০টি নিবন্ধিত চা বাগান এবং প্রায় ৯৭ হাজার স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন। অস্থায়ী শ্রমিকসহ মোট সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। এক দশক ধরে চা আমদানিতে উচ্চ শুল্কারোপ করে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা হলেও গবেষণা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় উৎপাদনশীলতা না বাড়ায় পিছিয়ে পড়ছে খাতটি, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন চা শ্রমিকরা।

পাঠকপ্রিয়