মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য একটি ‘মানবিক করিডর’ স্থাপনে বাংলাদেশের নীতিগত সম্মতির বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এক বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে দেশে ব্যাপক আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সরকারের ব্যাখ্যা চেয়েছে, তাদের মতে এতে দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
যদিও প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে পরে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সরকার কোনো নির্দিষ্ট ‘মানবিক করিডর’ নিয়ে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে আলোচনা করেনি। তাদের অবস্থান হলো, রাখাইনে জাতিসংঘের নেতৃত্বে মানবিক সাহায্য দেওয়া হলে বাংলাদেশ শুধু লজিস্টিকস সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
এই বিতর্কের প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে – মানবিক করিডর বা হিউম্যানিটারিয়ান প্যাসেজ আসলে কী? এটি কীভাবে কাজ করে এবং এর সঙ্গে কী ধরনের ঝুঁকি জড়িত?
মানবিক করিডর কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম (রফিক শাহরিয়ার) বলছেন, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যেখানে মানুষ জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী (খাদ্য, ঔষধ) পায় না অথবা বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, সেখানেই মানবিক করিডরের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার আইনের আওতায় যাদের সরাসরি সাহায্য করা কঠিন, তাদের জন্য এটি একটি বিশেষ ব্যবস্থা।
জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানবিক করিডর হলো জরুরি ত্রাণ সরবরাহের জন্য একটি নিরাপদ পথ, যার মাধ্যমে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় অবাধে সাহায্য পৌঁছানো যায়। এটি হতে পারে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকা অথবা একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিরাপদ চলাচলের অনুমতি।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সংজ্ঞায়, এটি সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত পক্ষগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনুমোদিত নিরাপদ প্যাসেজ, যা বেসামরিক নাগরিকদের এলাকা ত্যাগ, ত্রাণ আনা-নেওয়া বা আহত/নিহতদের সরাতে ব্যবহৃত হতে পারে।
কীভাবে স্থাপিত ও পরিচালিত হয়?
জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা মোশতাক আহমেদ জানান, মানবিক করিডর বিবদমান পক্ষগুলোর নিজেদের মধ্যে আলোচনা বা জাতিসংঘের মতো তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় স্থাপিত হতে পারে। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত দেশের সম্মতিতে এবং মানবিকতা, নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করে এই সহায়তা দেওয়া উচিত। করিডরটিকে একটি অসামরিক এলাকা (Demilitarized Zone) হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঘোষণা করা হয় এবং সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে তাতে সম্মত হতে হয়।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি) জোর দিয়ে বলেছে, সব পক্ষের সম্মতিতেই করিডরের নিরাপত্তা ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য (ত্রাণ নাকি জন স্থানান্তর) পরিষ্কারভাবে সংজ্ঞায়িত থাকতে হয়। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলছেন, বিবদমান পক্ষগুলো রাজি না হলে কখনো কখনো জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে করিডরের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করা হয়।
ইতিহাস ও কার্যকারিতা: সাফল্য বনাম ব্যর্থতা
মানবিক করিডরের ধারণা নতুন নয়। ১৯৩৮-৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি থেকে ইহুদি শিশুদের যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা (কিন্ডারট্রান্সপোর্ট) এর প্রাচীন উদাহরণগুলোর একটি। সাম্প্রতিককালে বসনিয়ার সারায়েভো (১৯৯২-৯৫), সিরিয়ার ঘৌতা (২০১৮), ইথিওপিয়ার টাইগ্রে (২০২২) অঞ্চলে করিডর স্থাপিত হয়েছে। রেড ক্রস বলছে, গত কয়েক দশকে এমন করিডর লাখ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।
কিন্তু এর ব্যর্থতা ও ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণও কম নয়। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, “অনেক জায়গায় নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিবদমান পক্ষ করিডরে আক্রমণ করেছে, এমনকি সেতু উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।”
মোশতাক আহমেদ ১৯৯৩ সালে বসনিয়ার সেব্রেনিৎসাসহ ছয়টি এলাকাকে ‘নিরাপদ এলাকা’ ঘোষণার উদাহরণ টেনে বলেন, “নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে তার রূপরেখা না থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয় এবং ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিৎসায় গণহত্যা ঘটে।”
ইয়েমেনে করিডর স্থাপনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কঙ্গোতে ২০০৮ সালে স্থাপিত করিডর সামরিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। এমনকি ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়া ও ইউক্রেন সম্মত করিডরও বাস্তবে সীমিত ও অনিরাপদ প্রমাণিত হয়েছে; বেসামরিক মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে এবং কনভয়ে হামলাও হয়েছে।
ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবিক করিডরের রাজনৈতিক ও সামরিক অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। এটি অস্ত্র পাচার বা দখলকৃত এলাকায় চোরাচালানের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় করিডর পর্যন্ত নিরাপদে পৌঁছানোও ত্রাণকর্মী ও বেসামরিকদের জন্য কঠিন হতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, সংঘাতে লিপ্ত সব পক্ষকে চুক্তিতে রাজি করানো এবং তা টিকিয়ে রাখা। মোশতাক আহমেদ মনে করিয়ে দেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে গিয়ে জাতিসংঘের পক্ষেও অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এনআরসি বলছে, করিডর নিরাপদ, প্রবেশযোগ্য ও কার্যকর হতে হবে এবং সব পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত সমঝোতা থাকতে হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার তার অবস্থান স্পষ্ট করলেও, মানবিক করিডর নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে জটিল অভিজ্ঞতা ও ঝুঁকি রয়েছে, তা এই বিতর্ককে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে এমন করিডর স্থাপনের আগে তার সম্ভাব্য সব দিক ও পরিণতি গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।