সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

নানা সংকটে ছোট হচ্ছে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বাজার, ওজন স্কেলকে দুষছেন ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেল স্থাপন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং নৌপথে পণ্য পরিবহনে ধসসহ বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের বাণিজ্য ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। গত দেড় দশকে বেশ কিছু বড় শিল্পগ্রুপ তাদের ব্যবসা এই বাজার থেকে সরিয়ে নিয়েছে। সম্প্রতি পাওনা টাকা নিয়ে ব্যবসায়ীদের উধাও হওয়ার কয়েকটি ঘটনাও এখানকার ব্যবসার প্রতি আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে।

তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো, চাক্তাই ও রাজাখালী খালের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় নির্মিত স্লুইস গেটের কারণে ব্যবসায়ীরা এখন জোয়ারের পানির জলাবদ্ধতা থেকে অনেকাংশে মুক্তি পেয়েছেন। একসময় ভারি বৃষ্টিপাত ছাড়াই শুধু জোয়ারের পানিতেই তলিয়ে যেত এই এলাকার নিচু অংশগুলো। কিন্তু এখন সেই ভোগান্তি কমেছে। যদিও স্লুইস গেটের প্রবেশপথ ছোট হওয়ায় বড় নৌকা চাক্তাই খালে ঢুকতে পারছে না, যা নৌ বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

খাতুনগঞ্জের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারের পুরনো জৌলুস ফেরাতে হলে প্রথমেই সড়ক প্রশস্ত করে যানজট নিরসন করতে হবে। যানজটের কারণে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। পাশাপাশি নৌপথে পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে ওজন স্কেল প্রত্যাহার করা জরুরি। তাদের মতে, এই ওজন স্কেল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জন্য “গলার কাঁটা” হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ দেশের অন্য কোনো মহাসড়কে এমন ব্যবস্থা নেই। এর ফলে এখানকার ব্যবসায়ীরা একটি ট্রাকে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারছেন না, যেখানে অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা একই ভাড়ায় ১৬-১৭ টন পণ্য নিচ্ছেন, যা ভোগ্যপণ্যের দামেও প্রভাব ফেলছে।

তারা আরও জানান, একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আমদানিকারকরা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে পণ্য গুদামজাত করে সারাদেশে সরবরাহ করতেন। কিন্তু এখন সড়কপথে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় (ওজন স্কেলের কারণে) অনেক আমদানিকারক লাইটার জাহাজে করে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ বা যশোরের নওয়াপাড়ায় সরাসরি পণ্য খালাস করছেন।

ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে প্রায় দশ হাজারের বেশি ছোট-বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা বহু বছর ধরে বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি একাধিক ব্যবসায়ীর টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার ঘটনা এই বিশ্বাসের বাণিজ্যে চিড় ধরিয়েছে।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, “খাতুনগঞ্জের ব্যবসা কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেল। দেশের আর কোনো মহাসড়কে এটি নেই। এটিকে চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ এবং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের একটি কৌশল বলে মনে হচ্ছে।”

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু বক্কর বলেন, “একসময় মৌখিক বিশ্বাসই ছিল খাতুনগঞ্জের লেনদেনের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু কয়েকটি প্রতারণার ঘটনায় সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে, যা ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”

চাক্তাই আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আহসান খালেদ পারভেজ জানান, যানজটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে তাদের প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন, ফলে চাক্তাইয়ের ব্যবসার অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

পাঠকপ্রিয়