মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) দমন-পীড়ন ও জোরপূর্বক সেনাদলে অন্তর্ভুক্তি এড়াতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে আবারও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে রোহিঙ্গারা। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ালেও দুর্গম পথ ও দালালদের তৎপরতায় তা পুরোপুরি ঠেকানো যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ জন রোহিঙ্গা নতুন করে ক্যাম্পে প্রবেশ করছেন। তিনি বলেন, “আমরা ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে আসা এক লাখ ১৮ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন করেছি। আরও অনেকে নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছেন, যাদের খাদ্য সহায়তার জন্য টোকেন দেওয়া হয়েছে।” তবে, এই টোকেন গ্রহণকারীদের মধ্যে কিছু পুরাতন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশিও থাকায় মোট বিতরণকৃত টোকেনের সংখ্যা তিনি উল্লেখ করেননি।
নতুন এই রোহিঙ্গারা আগে থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন, যাদের বেশিরভাগই ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের সময় পালিয়ে এসেছিলেন।
রাখাইনের মংডুর এক রোহিঙ্গা যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আরাকান আর্মি তাদের সামরিক শাখায় জোরপূর্বক লোক भर्ती করছে জান্তার বিরুদ্ধে লড়তে। এটি এড়াতেই অনেকে পালাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমরা আরাকান আর্মির পাশে থেকে দেশের জন্য লড়াই করতে চাই, তবে তাদের প্রথমে মিয়ানমারে আমাদের নাগরিকত্বের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”
ওই যুবক আরও অভিযোগ করেন, “আরাকান আর্মির সদস্যরা প্রায়শই আমাদের বাড়িতে অভিযান চালায়, অনেককে আরসা সদস্য আখ্যা দিয়ে ধরে নিয়ে যায় এবং গ্রামবাসীকে খোলা আকাশের নিচে তাড়িয়ে দেয়। তারা যা পায় তা-ই লুট করে।” গত রোববার মংডুর সিকদারপাড়া গ্রামে আরাকান আর্মি অভিযান চালিয়ে গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে বাড়িঘর তল্লাশি করে, ১০ জনকে আটক করে এবং রোহিঙ্গাদের পাঁচটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় বলে তিনি জানান। এই আগুনের ধোঁয়া টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকেও দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মো. জুবায়ের অভিযোগ করেন, “আরাকান আর্মি পদ্ধতিগতভাবে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ রোহিঙ্গা এখনো রাখাইনে আছে এবং তাদের অনেকে পালিয়ে যেতে চান। যারা পালানোর চেষ্টা করেন, আরাকান আর্মি তাদের কাছ থেকে চাঁদাও নেয়। মাঠে যাওয়া, ব্যবসা করা বা গ্রামের বাইরে যাওয়ার জন্য তাদের টোল দিতে হয়।” এমন নিপীড়ন অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে আরেকটি বড় ধরনের রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। রোহিঙ্গা শিবিরের নেতারাও আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান নিপীড়নের কারণে সামনের দিনে নতুন করে রোহিঙ্গা ঢলের আশঙ্কা করছেন, কারণ বাহিনীটি বর্তমানে রাজ্যটির ৮০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানা গেছে।
টেকনাফে বিজিবি ব্যাটালিয়ন-২ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিকুর রহমান জানান, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর বরাবর কঠোর নজরদারি থাকায় সংঘবদ্ধ পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করাচ্ছে। তিনি বলেন, “পাচারকারীরা কৌশল পরিবর্তন করায় বিজিবিকেও ঘন ঘন প্রতিরোধ কৌশল পরিবর্তন করতে হচ্ছে।” সম্প্রতি অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টাকালে অনেক রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।