আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ অপারেশনাল কার্যক্রম প্রায় নিরবচ্ছিন্ন রাখার ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনদের প্রত্যাশিত সক্রিয়তা না থাকলে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
বন্দরের ঘোষণা অনুযায়ী, ঈদের দিন মাত্র ৮ ঘণ্টা (সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা) অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, বাকি ছুটির দিনগুলোতে ২৪ ঘণ্টাই সচল থাকবে বন্দর। তবে, এই দীর্ঘ ছুটিতে ব্যাংক, কাস্টমস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, পরিবহন এবং অন্যান্য জরুরি সেবা সীমিত থাকলে পণ্য খালাস প্রক্রিয়া কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রায় ১০ দিনের টানা ছুটিতে বন্দরে পণ্য ওঠানামা চালু থাকলেও যদি পুরো সাপ্লাই চেইন – অর্থাৎ ব্যাংক, কাস্টমস, পণ্য পরিবহন, কারখানা – সচল না থাকে, তবে বন্দর খোলা থাকার সুফল পাওয়া যাবে না। এতে ঈদের পর বন্দরে কনটেইনার জট সৃষ্টি হওয়াসহ সার্বিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদন খাত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী বিএসআরএম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমের আলী হুসাইন বলেন, “শুধু বন্দর ২৪ ঘণ্টা চালু থাকলেই হবে না, পুরো সাপ্লাই চেইন সচল থাকতে হবে। ঈদের ছুটি এখন ১০ দিন পর্যন্ত হচ্ছে, যা আগে তিন-চারদিন ছিল। এই দীর্ঘ ছুটির যৌক্তিকতা আমি বুঝি না। এর ফলে ছুটি শেষে বন্দরে হঠাৎ চাপ বাড়ে এবং ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহে বিলম্ব হয়। সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবেই এমনটা হয়। এমন দীর্ঘ ছুটিতে বন্দরের পাশাপাশি পরিবহন, ব্যাংকিং, শুল্কায়নসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতের সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি, কিন্তু তার কোনো কিছুই দৃশ্যমান নয়। এতে উৎপাদন খাত ও সরকারের রাজস্ব উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল বলেন, “১০ দিনের ছুটি মানে মাসের প্রায় অর্ধেক সময় উৎপাদন বন্ধ থাকা। তার ওপর সপ্তাহে এখন পাঁচদিন কাজ। লম্বা ছুটি উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটায়। ছুটির সময় বন্দর খোলা থাকলেও ব্যাংক, কাস্টমসসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ডেলিভারি বা শুল্কায়ন সম্ভব হয় না। ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত হওয়ায় এলসি কার্যক্রমও স্থবির হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে একটি অচলাবস্থা তৈরি হয়, যা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য উদ্বেগের।”
প্রিমিয়ার সিমেন্ট পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “টানা ১০ দিন উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে ছিটকে গেলে তা পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। এর আগেও ঈদুল ফিতরে নির্বাহী আদেশে ছুটি বাড়িয়ে নয়দিন করা হয়েছিল, যা আমাদের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। পৃথিবীর কোথাও এমন দীর্ঘ ছুটি দেখা যায় না। চীনে আমি দেখেছি, রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনেও বাজার থেকে ব্যাংক পর্যন্ত সবকিছু খোলা থাকে। আর আমাদের দেশে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদন ও আর্থিক লেনদেন স্থবির হয়ে পড়ে।”
তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, ঈদের ছুটিতে এমনিতেই শ্রমিকদের বাড়তি ছুটি দিতে হয়, তার ওপর সরকারি ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় কারখানায় উৎপাদন শুরু করতে দেরি হয় এবং বন্দর থেকে পণ্য খালাসেও বাধা তৈরি হয়। বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি ও কম্বাইন্ড অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, “ছুটির সময় পণ্য ডেলিভারি নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের দাবি, ১০ দিনের ছুটির কারণে যেন পোর্ট ডেমারেজ সম্পূর্ণ মওকুফ করা হয় এবং ছুটির পর সৃষ্ট চাপ সামলাতে বন্দর কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেবে, তা আমাদের জানানো হোক।”
চট্টগ্রাম সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক আলমগীর জানান, “শুধু বন্দর খোলা থাকলে হবে না। কাস্টমস, ব্যাংকিং, শিপিং, কোয়ারেন্টাইন, বিএসটিআইসহ সব সংস্থার ছুটির মধ্যে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। নতুবা আমদানিকারকরা জরিমানার শিকার হবেন এবং পণ্যের মূল্যও অযৌক্তিকভাবে বাড়বে।”
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল আলম সুজন বলেন, “এই চেইনের একটি সংস্থাও যদি বন্ধ থাকে, পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়। ডেলিভারির সময় শ্রমিক পাওয়া যায় না, ব্যাংক বন্ধ থাকে, নগদ অর্থের ব্যবস্থাপনা কঠিন হয় এবং পরিবহন সংকট দেখা দেয়।”
এসব উদ্বেগের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, “ঈদুল আজহার দিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা বন্দরের অপারেশনাল কাজ বন্ধ থাকবে। বাকি সব দিন বন্দর ২৪ ঘণ্টা পুরোপুরি সচল থাকবে। এর সুফল পেতে হলে সব স্টেকহোল্ডারকে সক্রিয় থাকতে হবে। আমরা দ্রুত পণ্য ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আমদানিকারকরা যদি এগিয়ে না আসেন, তাহলে দীর্ঘ ছুটির পর বড় চাপ সৃষ্টি হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।”
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কর্মঘণ্টা কমে আসা এবং দীর্ঘ ছুটির কারণে বছর শেষে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং জাতীয় রাজস্ব আয়ও কমতে পারে।