এক সময় পদ্মার বুকে মাঝির উদাস করা ভাটিয়ালি গানের সুর যেমন ছড়িয়ে পড়ত বাতাসে, তেমনি উত্তাল ঢেউ আর প্রমত্ত স্রোত জানান দিত তার ভরা যৌবনের। ‘পদ্মার ঢেউ রে —মোর শূন্য হৃদয়–পদ্ম নিয়ে যা, যা রে’—এমন গান আর শোনা যায় না সেই আগের মতো। সময়ের প্রবাহে দেশের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে বয়ে যাওয়া এই নদী আজ তার চিরচেনা রূপ, যৌবন আর উন্মত্ত ঢেউ হারিয়ে মৃতপ্রায়। শুকনো মৌসুম এলে বিশাল পদ্মার বুকে জেগে ওঠে ধু ধু বালুচর, যা দেখে চেনার উপায় নেই এটিই এককালের সেই খরস্রোতা পদ্মা।অথচ কী দিন ছিল এই পদ্মার আর তার পাড়ের বাসিন্দাদের। রাজশাহীর শ্রীরামপুরের মিলন মাঝি, যার দাদা ও বাবার হাত ধরে পদ্মায় নৌকাবাইতেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “১৯৮০ সাল থেকে আমার দাদায় এখানে নৌকা বাইত, এরপর আমার বাপ আর তারপর আমি। বাবা-দাদার লগে যখন নৌকা বাইতাম এই পদ্মা তখন পানিতে থৈ থৈ করতো, এখন তো মইরাই গেল কওয়া যায়।” পদ্মার দুর্দশার কারণে এখন তিনি আর মাঝি নন, পরের জমিতে কাজ করেই চলে তার সংসার।
পদ্মার এই ভয়াবহ দশার জন্য সরাসরি দায়ী উজানে ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ। গঙ্গা নদী ভারতে পদ্মা নামে পরিচিতি পাওয়ার আগেই এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নদী ব্যবহারের মৌলিক নীতি উপেক্ষা করে অত্যন্ত চতুরতার মাধ্যমে বাঁধটি নির্মাণ করে ভারত সরকার গঙ্গার পানির ওপর কার্যত একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর ফলে শুকনো মৌসুমে যখন বাংলাদেশের জন্য পদ্মায় পানির প্রবাহ অত্যাবশ্যক, তখন ফারাক্কায় গেট বন্ধ করে পানি আটকে দেওয়া হয়। এতে ভাটি অঞ্চলে পানির অভাবে নদীতে চর জেগে ওঠে, স্রোতধারা শুকিয়ে যায়। আবার বর্ষাকালে যখন ভারতে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে পানি বাড়ে, তখন হঠাৎ করে বাঁধের সব গেট খুলে দেওয়া হয়, যার ফলে বাংলাদেশের পদ্মার ভাটি অঞ্চলে আকস্মিক ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয় এবং তৈরি হয় মানবিক বিপর্যয়।
বাংলাদেশের মানুষের পানির অধিকার ক্ষুণ্নকারী এই ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল ধরে এদেশের রাজনৈতিক নেতা, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ মানুষ সোচ্চার রয়েছেন। ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের স্বার্থ এবং জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে প্রথম বড় আন্দোলন গড়ে তোলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে তিনি ঐতিহাসিক ফারাক্কা অভিমুখে লং মার্চ কর্মসূচির ডাক দেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট হাই স্কুল মাঠে লং মার্চের বিশাল সমাবেশে মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জোরালো দাবি জানান। এই আন্দোলন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ১৬ মে ‘ফারাক্কা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
ফারাক্কা বাঁধটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদহ ও মুর্শিদাবাদের সীমানা দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গা নদীর ওপর অবস্থিত। এই সমস্যার সূত্রপাত ঘটে ১৯৫০-এর দশকের গোড়ার দিকে। গঙ্গা নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ভারতীয় উদ্যোগের খবর পেয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। জবাবে ভারত সেসময় জানায় যে বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি কেবল অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। ১৯৬০ সালে ভারত এ বিষয়ে প্রথম পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠকে বসে। তবে আশ্চর্যজনকভাবে, আলাপ-আলোচনা চলা অবস্থায়ই ভারত ১৯৬১-৬২ সালে গোপনে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে দেয়। এভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগেই, ১৯৭১ সালের আগেই ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করে ভারত।
কলকাতা বন্দরের নাব্যতা বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত, অর্থাৎ মাত্র ৪১ দিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে ফারাক্কা বাঁধের ফিডার ক্যানেল চালুর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু সেই ‘পরীক্ষামূলক’ সময় আর শেষ হয়নি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে প্রায় ৫০ বছর, অথচ ফারাক্কা বাঁধের গেটগুলো ব্যবহার করে ভারত আজও পানি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।
এই বাঁধটিই পদ্মার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত শুকনো মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি অন্য খাতে সরিয়ে নেওয়ার কারণে গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের পদ্মায় ব্যাপক হারে চর জেগেছে, শুকিয়ে মরে গেছে পদ্মার উৎস থেকে সৃষ্ট বহু নদ-নদী। বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যে পড়েছে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব। সেইসঙ্গে প্রতি বছরই বাংলাদেশকে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। অন্যদিকে, বর্ষাকালে ভারতে পানির চাপ বাড়লে ফারাক্কার সব গেট একসাথে খুলে দেওয়ার কারণে গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রায় প্রতি বছরই ভয়াবহ বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতেও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
মৃত্যুমুখে পদ্মার শাখা নদী ও ঐতিহ্যবাহী বন্দর
‘এই পদ্মা এই মেঘনা এই যমুনা সুরমা নদী তটে’—এই গানের মতোই বাংলাদেশের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ পদ্মা নদী। পদ্মা কেবল নিজেই একটি নদী নয়, এটি ছিল অসংখ্য ছোট-বড় নদ-নদীর উৎসধারা। কিন্তু উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের ফলে পদ্মার পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় এর বহু শাখা নদী আজ মৃতপ্রায় বা সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গবেষণা বলছে, চলতি বছর পদ্মানদীর প্রবাহ একেবারেই নগণ্য; প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে। পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, নগরীর তালাইমারীর জাহাজঘাট এলাকায় মানুষ হেঁটেই নদী পার হচ্ছে।
নদী ও পানি বিষয়ক নাগরিক সংগঠন রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন জানান, উজানে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মার পানি প্রবাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। এই বাঁধের কারণে যেসব নদীর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এবং যেগুলো মৃতপ্রায় তার মধ্যে পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াই, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা দিয়ে প্রবাহিত মাথাভাঙ্গা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ জেলার খুলনা বিভাগের কুমার নদ ও কপোতাক্ষ নদ, চুয়াডাঙ্গা জেলার ভৈরব নদ, নবগঙ্গা নদী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার চন্দনা নদী, কুষ্টিয়ার হিসনা নদী, মানিকগঞ্জের কালিগঙ্গা নদী উল্লেখযোগ্য। এসব নদীর উপশাখাগুলোও মারা যাচ্ছে এবং নদ-নদীগুলো তাদের নিজস্ব মোহনা হারাচ্ছে। পদ্মার পানি সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যতম বড় নদী হলো বড়াল। রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখে এখন বিশাল চর জেগে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে।
পদ্মাপাড়ে সত্তরোর্ধ্ব জয়নাল মিয়া তার স্মৃতিচারণ করে বলেন, “একটা সময় ছিল যখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গিপুর থেকে নৌকা অথবা জাহাজে মালভর্তি করে সরাসরি রাজশাহীর গোদাগাড়ীর রেলবাজার বন্দরে আসতো। আবার রেলবাজার বন্দর থেকেও মালামাল নিয়ে নৌকা ও জাহাজগুলো ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হতো। কিন্তু নদীর এই দূরবস্থার কারণে রেলবাজার বন্দরটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে যায়।”
পরিবেশগত বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব
ফারাক্কার প্রভাবে পদ্মার বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় পুরো নদীটি বালুচরে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশ বিজ্ঞানী ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সারওয়ার জাহান। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনবে, যার লক্ষণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট। আবহাওয়া, প্রকৃতি ও ঋতুবৈচিত্র্যে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শুকনো মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক এলাকায় এখন অগভীর নলকূপেও পানি ওঠে না। এই সংকট মোকাবিলায় চুক্ত অনুযায়ী পদ্মার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের ওপর জোর দেওয়া অত্যাবশ্যক। তিনি সরকারের যথাযথ ভূমিকা কামনা করেন এবং আশা করেন, ভারতের সঙ্গে পানিচুক্তি নবায়ন নিয়ে শিগগির সমস্যা মিটবে। অধ্যাপক সারওয়ার জাহানের অভিমত, শুধু কাগজে-কলমে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পেলেই হবে না, চুক্তি নবায়ন করা হলে পানির পরিমাণ এমন হতে হবে যাতে নদীতে সারা বছর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ফারাক্কার মতো বাঁধের কারণে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, আর এর ফলে তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে নদীতে যখন পানি ছিল, তখন পানি তাপমাত্রা শোষণ করে নিতো, কিন্তু এখন ধু ধু বালু সরাসরি তাপমাত্রা শোষণ করছে, ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে। এটি বৈশ্বিক জলবায়ুতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ার কারণে বালু উত্তোলনের প্রসঙ্গ টেনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম ফরিদ বলেন, নদীর মৃত্যু ঘটায় সেখানে বালু উত্তোলনের যে ব্যবসা হচ্ছে, তা পরিবেশকে ভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ড্রেজিংয়ের কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে এবং এটি জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলছে।
উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও সুন্দরবনের ঝুঁকি
ফারাক্কা বাঁধের কারণে কেবল পদ্মার নিকটবর্তী জনপদই নয়, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ছে দূরবর্তী উপকূল অঞ্চলেও। রিভারাইন পিপল’র মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, স্বাভাবিক অবস্থায় নদীর মিঠা পানি জোয়ারের সময় সমুদ্রের লোনা পানিকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে বাধা দেয় বা ঠেলে ফেরত পাঠায়। কিন্তু ফারাক্কার কারণে পদ্মার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় লোনা পানি সহজেই অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এটি উপকূলীয় মানুষের জন্য চরম দুর্দশা এবং তাদের চোখের নোনাজলের কারণ হয়েছে।
লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে সুন্দরবনের মিষ্টি পানিনির্ভর বৃক্ষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সুন্দরী গাছে আগামরা রোগ দেখা যাচ্ছে এবং গাছের সংখ্যা কমছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমায় পলি সুন্দরবনের ভেতরে জমা হচ্ছে এবং জোয়ারের পানি বনে প্রবেশে বাধা পাচ্ছে। এসব কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবন ধ্বংসের মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে, যা বাংলাদেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
কৃষিজ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ও ইলিশের স্বাদ হারানো
পদ্মা নদী বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকাজে পানির অন্যতম প্রধান উৎস। উজানে ফারাক্কায় পানি আটকে রাখায় বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়ছেন। বাপা’র কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সম্পাদক ফরিদুল ইসলাম ফরিদ বলেন, এর কারণে মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে এবং ফসলি জমিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। পদ্মার অববাহিকাতে নদী ভাঙন প্রবণতাও বাড়ছে, ফলে কৃষকরা তাদের ফসলি জমি হারাচ্ছেন। বাঁধের কারণে বন্যার পানি কমে যাওয়ায় মাটির উর্বরতাও কমে যাচ্ছে।
গবেষণা সংস্থা ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’র প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। ৪০০ ফুট নিচেও অনেক জায়গায় পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের খরচ বাড়ায় সেচ খরচও বাড়ছে, যা কৃষকের ওপর বোঝা। ফলে বেশি পানি প্রয়োজন হয় বলে অনেক কৃষক এখন ধান বাদ দিয়ে গম বা যব চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মায় পানি সংকটে ইলিশের প্রজননও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফরিদুল ইসলাম ফরিদ আক্ষেপ করে বলেন, আগে পদ্মার ইলিশের যে স্বাদ ও ঘ্রাণ ছিল, তা এখন আর নেই। ইলিশের গতিপথও বদলে গেছে; পদ্মায় কমে গেলেও যমুনা ও তিস্তাতেও এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।
জীববৈচিত্র্যের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব
ফারাক্কা বাঁধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের ওপরও পড়ছে, বিশেষ করে সুন্দরবনের প্রাণীদের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব দৃশ্যমান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবনে গঙ্গা নদী থেকে যে মিঠা পানি আসার কথা ছিল, তা কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বাড়ছে। পদ্মার সঙ্গে সংযোগকারী নদীগুলো মরে যাওয়ায় পূর্ব সুন্দরবনের তুলনায় পশ্চিম সুন্দরবনে এর বিরূপ প্রভাব বেশি। এসব কারণে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। হরিণের সংখ্যা কমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা লবণাক্ততার কারণে হতে পারে। হরিণের সংখ্যার সঙ্গে আবার বাঘের সংখ্যাও সম্পর্কিত। নদীগুলোতে মাছের প্রজননেও প্রভাব পড়ছে, এবং রিভার ডলফিনের সংখ্যাও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।
আন্তর্জাতিক আদালতের বিচার ও চুক্তির দুর্বলতা
ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইতে হলে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নদীর পানিপ্রবাহ সংক্রান্ত কনভেনশনে সই করার পরামর্শ দিয়েছেন ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’র প্রধান নির্বাহী এম জাকির হোসেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এই সরকার এটি করতে পারল না। তিনি মনে করেন, ভারত, চীন ও নেপালের সঙ্গে একটি জিবিএম (গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা) বেসিন কমিশন গঠন করা উচিত।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ নেই, অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ ন্যূনতম কতটুকু পানি পাবে তার নিশ্চয়তা নেই। চুক্তিতে ডাটা শেয়ারিংয়ের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ফলে পানি প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া, চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো আন্তর্জাতিক সালিশি ব্যবস্থার উল্লেখ নেই, যা নেপালের সঙ্গে ভারতের মহাকালী পানিচুক্তিতে রয়েছে। জাকির হোসেন মনে করেন, নদীর প্রাকৃতিক নিয়ম বা সত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় আইনের মিল নেই এবং বাঁধ দিয়ে নদীকে মেরে ফেলা প্রকৃতির ওপর অন্যায় ও অপরাধ, যা ‘ন্যাচার রাইটস’ হরণ করছে। রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি ব্যবহৃত হচ্ছে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে নয়।
কত মাশুল গুনবে বাংলাদেশ?
জানা যায়, ১৯৯৬ সালের চুক্তির পর পদ্মার রাজশাহী অংশে পানিপ্রবাহে কিছুটা উন্নতি হলেও তা চুক্তি অনুযায়ী ছিল না। চুক্তির শর্ত ছিল, ১ জানুয়ারি থেকে ১০ মে পর্যন্ত ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার নিচে হলে দুই দেশ ৫০ হাজার কিউসেকের সমান অর্ধেক (২৫ হাজার কিউসেক) করে পাবে এবং বাকি ২০ হাজার কিউসেক ৭টি নদীর নাব্যতা রক্ষায় ব্যবহৃত হবে। আর প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নামলে দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে পানি বণ্টন করবে। কিন্তু ভারত এক্ষেত্রে একতরফাভাবে পানি নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির পরিমাণ কমছে। ভারতের অনাগ্রহের কারণেই যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক অনিয়মিত এবং হলেও তার ফল শূন্য। এর চরম মাশুল দিতে হচ্ছে নদীমাতৃক বাংলাদেশকে।
পদ্মা নদীর স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে এবং ভাটি অঞ্চলের পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন বাঁচাতে ফারাক্কা সমস্যার ন্যায্য ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান আজ অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবতার স্বার্থে এই অমীমাংসিত পানি বিরোধের দ্রুত নিরসন প্রয়োজন।