সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা যেন লুটপাটের স্বর্গরাজ্য, এস আলমের একাই থাবা

নিজস্ব প্রতিবেদক

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ব্যাংকিং খাতে ঘটে যাওয়া ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাটের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে ইসলামী ব্যাংকের ঘটনায়। বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ একাই এই ব্যাংক থেকে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির জন্য এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যাংকটির কয়েকজন কর্মকর্তা এবং এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে।

ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, শুধুমাত্র খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এস আলম গ্রুপ যে ৪৫ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে, সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যাংকটির সময় লাগবে কমপক্ষে ১৩ বছর। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির কাছে রয়েছে মাত্র ৫৫৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকার যোগ্য জামানত। ফলে, এস আলম গ্রুপ স্বেচ্ছায় টাকা ফেরত না দিলে আইনগতভাবে এই ঋণ আদায় করা ব্যাংকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে মালিকানা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত খাতুনগঞ্জ শাখার কতিপয় কর্মকর্তা এস আলম গ্রুপকে এই লুটপাটে সহযোগিতা করেছেন। এদের মধ্যে অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এই অনিয়মে অংশ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে একটি শাখা থেকে এত বিশাল অঙ্কের অর্থ লোপাট সম্ভব হয়েছে, যা দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

খাতুনগঞ্জ শাখার ঋণ বিতরণে কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট টিমের মতে, “ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখায় বিগত কয়েক বছর কার্যত কোনো ব্যাংকিং হয়নি; যা হয়েছে তা স্বাভাবিক ব্যাংকিং নিয়মাচারের সম্পূর্ণ বিপরীত।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকটির শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের কয়েকজন অতি উৎসাহী, অসাধু, দুর্নীতিগ্রস্ত ও উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে এস আলমের সঙ্গে যোগসাজশে বিনিয়োগের নামে ব্যাংকের বিপুল অর্থ আত্মসাতে মূল ভূমিকা পালন করেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিমের এক কর্মকর্তা জানান, ঋণের বিপরীতে এস আলম গ্রুপের ১১ হাজার শতক জমি, ১৫ হাজার বর্গফুট ফ্লোর স্পেস, স্থাপনা, মেশিনারিজ, নগদ ও এফডিআর মিলে মোট ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সহায়ক জামানত দেখানো হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে এমন অনেক সম্পত্তি রয়েছে যা এখনো এস আলমের নামে নামজারি হয়নি অথবা ইসলামী ব্যাংকের অনুকূলে আইজিপিএ (অপরিবর্তনীয় সাধারণ পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) সম্পাদন করা হয়নি। ফলে এই সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক রাখারও সুযোগ নেই ব্যাংকের। এই পরিস্থিতিতে ঋণের প্রায় পুরোটাই ব্যাংককে তার মুনাফা থেকে প্রভিশন করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, মেসার্স সোনালী ট্রেডার্স, ডেলটা অয়েল রিফাইনারি, মেসার্স সাদিয়া ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, ওজি ট্রাভেলস, এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম রিফাইনড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম স্টিলস, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি, সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টস, মেসার্স আদিল করপোরেশন, ইনফিনিয়া সিনথেটিক ফাইবার, জেনেসিস টেক্সটাইল অ্যাকসেসরিজ অ্যান্ড অ্যাপারেলস, চেমন ইস্পাত, এস আলম ক্লোড রোল্ড স্টিল, সাভোলা অয়েল ও ইনফিনিটি সিআর স্ট্রিপসের নামে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে।

এইসব প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে মোহাম্মদ সাইফুল আলম, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন, সহোদর ওসমান গণি, রাশেদুল আলম, শহিদুল আলম, আব্দুস সামাদ, ভাইয়ের স্ত্রী শাহানা ফেরদৌস ও ভাগনে মোস্তান বিল্লাহ আদিলসহ আত্মীয়স্বজন এবং বিভিন্ন কর্মকর্তা ও বেনামে ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে এস আলম গ্রুপকে দেওয়া সম্পূর্ণ ঋণই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ফলে শুধুমাত্র এই একটি শাখাতেই প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জ শাখার ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণের বিপরীতে ৪৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার প্রভিশন রাখার কথা থাকলেও সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।

সার্বিকভাবে ব্যাংকটিতে মোট ৭৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকার প্রভিশন রাখার প্রয়োজন হলেও ব্যাংক সংরক্ষণ করেছে মাত্র ৭ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। ফলে মোট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। আশ্চর্যজনকভাবে, ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার আমানত রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা, অথচ এর বিপরীতে শাখাটির মাধ্যমে দায় সৃষ্টি হয়েছে ৫৩ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে খাতুনগঞ্জ শাখা খেলাপি ঋণ দেখিয়েছিল ৩২ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শাখাটির প্রকৃত খেলাপি ঋণ ৬৫ হাজার ৭১৬ কোটি টাকায় ঠেকেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, “ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় বিগত কয়েক বছর যে লুটপাট হয়েছে, তা বিশ্বের ব্যাংক লুটপাটকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু খাতুনগঞ্জ শাখা কিংবা ইসলামী ব্যাংক নয়, দেশের বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশের আলোকে ইসলামী ব্যাংকসহ পুরো ব্যাংকিং খাতকে পুনরুদ্ধার করতে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক।”

অন্যদিকে, খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক এসভিপি জামাল উদ্দীন বলেন, “ইসলামী ব্যাংক জনগণের আস্থার প্রতীক। গ্রাহকের আস্থা ও আমানতের সুরক্ষায় আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। গত ৭-৮ বছর ব্যাংকের যে ক্ষতি হয়েছে, তা ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তত্ত্বাবধানে সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামি ব্যাংকিং ধ্বংস করার হীন চক্রান্ত।”

এই বিশাল আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা দেশের ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থাকে আরও একবার প্রকাশ্যে এনেছে এবং এর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে সব মহল থেকে।

পাঠকপ্রিয়