শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বহুল আলোচিত ‘তিন শূন্য’ তত্ত্ব – অর্থাৎ শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ – বাস্তবায়নকে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে ধরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তার প্রথম বাজেট প্রণয়ন করেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তারুণ্যের শক্তি, প্রযুক্তি, সুশাসন এবং সামাজিক ব্যবসাকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
সোমবার (২ জুন) উপস্থাপিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রথাগত প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক ধারণার চেয়ে মানুষের সার্বিক উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে একটি উন্নত সমাজ বিনির্মাণের উদ্দেশ্যে আমরা যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছি, তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বনভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ। যার মাধ্যমে আমূল পরিবর্তন হবে এ দেশের মানুষের জীবনমানের এবং মুক্তি মিলবে বৈষম্যের দুষ্টচক্র থেকে।”
তিনি আরও বলেন, “যে স্বপ্নকে ধারণ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভিত রচিত হয়েছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা একটি সুন্দর, বাসযোগ্য আবাসস্থল রেখে যেতে চাই। জনগণের জীবনযাত্রায় নিয়ে আসতে চাই এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ঢেউ। সে লক্ষ্য সামনে রেখেই এই বাজেট সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
অর্থ উপদেষ্টা তার বক্তব্যে এবারের বাজেটকে কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমরা বিগত বাজেটের চেয়ে ছোট আকারের বাজেট আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাব করছি। প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক ধারণা থেকে সরে এসে আমরা চেষ্টা করেছি সামগ্রিক উন্নয়নের ধারণায় জোর দিতে। তাই প্রথাগত ভৌত অবকাঠামো তৈরির খতিয়ান তুলে ধরার পরিবর্তে আমরা এবারের বাজেটে প্রাধান্য দিয়েছি মানুষকে।”
মানুষের জীবনমান, জীবিকা ও পরিবেশগত ভারসাম্য ছাড়া রাষ্ট্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে মন্তব্য করে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যে এবারের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুশাসন, নাগরিক সুবিধা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।”
এছাড়াও, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় রেখে একটি টেকসই ও অভিযোজনক্ষম উন্নয়নকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অর্থ উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন, এই বাজেট একটি রূপান্তরমুখী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে, যার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায্য সমাজ গঠনের শক্ত ভিত্তি রচিত হবে।