সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত, জরিমানা করেই দায় সারছে প্রশাসন

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চট্টগ্রামে গত চার দশকে প্রায় ২০০টির মধ্যে ১২০টি পাহাড়ই বিলীন হয়ে গেছে —এই একটি তথ্যই বলে দেয় নগরীর জলাবদ্ধতার সংকটের গভীরতা কতটুকু। পাহাড় কাটা এবং খাল-নালা দখলের দুষ্ট চক্রে বন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩২ লাখেরও বেশি মানুষের এই শহর। প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, মূল কারণগুলো রয়ে গেছে সমাধানের বাইরে। ফলে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে নগরবাসীর দুর্ভোগ যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো মূলত বালির হওয়ায় এর গঠন প্রকৃতি অত্যন্ত নাজুক। নগরবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরানের মতে, বালির তৈরি হওয়ায় এই পাহাড়গুলো খুব সহজেই ধসে পড়ে। পাহাড়ের কোনো অংশ কাটা হলে সামান্য বৃষ্টিতেই কয়েকগুণ বেশি বালি ও মাটি গড়িয়ে সরাসরি নগরের খাল-নালাগুলোতে গিয়ে মেশে। এতে দ্রুত পলি জমে নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খাল ও জলাধারগুলো ভরাট হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। পরিবেশকর্মী রীতু পারভীনের মতে, পাহাড় কাটার ফলে গাছপালা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেমন নিচে নামছে, তেমনি খাল-নালায় পলি জমে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মতো সংস্থাগুলো প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি হিলভিউ আবাসিক এলাকায় পাহাড় কেটে বাড়ি বানানোর মতো গুরুতর অপরাধে মাত্র ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করে দায় সেরেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে, ডেভেলপার কোম্পানি ‘সানমার’ পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করলেও জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নগরের বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় গেলে দেখা যায় পাহাড় দখলের এক মহোৎসব। সেখানে দৃশ্যমানভাবেই পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি, দোকান, মন্দির ও গির্জা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অসহায় মানুষদের আশ্রয়ের নামে প্রভাবশালী চক্র এই দখল প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। জামাল খান, পাহাড়তলী, আকবরশাহ ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকাতেও সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “পাহাড় হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার খুঁটি। এগুলো ধ্বংস হলে নগরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উষ্ণতার মুখে পড়বে।”

এই ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি নগরবাসীর অসচেতনতা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। নগরের বেশিরভাগ খাল ও নালা এখন ময়লার ভাগাড় বা গার্বেজ স্টেশনে পরিণত হয়েছে। নগরবাসীই অসচেতনভাবে সেখানে ঘরের ময়লা, ইলেকট্রনিকস বর্জ্য ও পুরোনো কাপড়চোপড় ফেলছেন, যা পানি প্রবাহে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করছে।

আইনের প্রয়োগহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান। তিনি বলেন, “পরিবেশ আইনের কার্যকারিতা নেই। মামলা হলেও চার্জশিট হয় না, রায় হয় না। পরিবেশ অধিদপ্তর বড়জোর ১ লাখ টাকা জরিমানা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে।”

এই বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, পাহাড় রক্ষায় তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন, তবে জনবলসংকটের কারণে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পাহাড় কাটা এবং খাল-নালা দখল বন্ধে সমন্বিত, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রামের মুক্তি প্রায় অসম্ভব। সামান্য জরিমানা বা মৌসুমি কিছু পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন, অন্যথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নগরীর ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

চট্টগ্রামে ১২০টি পাহাড় বিলুপ্ত, জরিমানা করেই দায় সারছে প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ জুন ২০২৫, ১৯:২৪

চট্টগ্রামে গত চার দশকে প্রায় ২০০টির মধ্যে ১২০টি পাহাড়ই বিলীন হয়ে গেছে —এই একটি তথ্যই বলে দেয় নগরীর জলাবদ্ধতার সংকটের গভীরতা কতটুকু। পাহাড় কাটা এবং খাল-নালা দখলের দুষ্ট চক্রে বন্দী হয়ে পড়েছে প্রায় ৩২ লাখেরও বেশি মানুষের এই শহর। প্রতি বর্ষায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নানা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও, মূল কারণগুলো রয়ে গেছে সমাধানের বাইরে। ফলে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে নগরবাসীর দুর্ভোগ যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো মূলত বালির হওয়ায় এর গঠন প্রকৃতি অত্যন্ত নাজুক। নগরবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরানের মতে, বালির তৈরি হওয়ায় এই পাহাড়গুলো খুব সহজেই ধসে পড়ে। পাহাড়ের কোনো অংশ কাটা হলে সামান্য বৃষ্টিতেই কয়েকগুণ বেশি বালি ও মাটি গড়িয়ে সরাসরি নগরের খাল-নালাগুলোতে গিয়ে মেশে। এতে দ্রুত পলি জমে নগরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খাল ও জলাধারগুলো ভরাট হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। পরিবেশকর্মী রীতু পারভীনের মতে, পাহাড় কাটার ফলে গাছপালা কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর যেমন নিচে নামছে, তেমনি খাল-নালায় পলি জমে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর ভূমিকা হতাশাজনক। পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা এবং বিদ্যুৎ বিভাগের মতো সংস্থাগুলো প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি হিলভিউ আবাসিক এলাকায় পাহাড় কেটে বাড়ি বানানোর মতো গুরুতর অপরাধে মাত্র ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করে দায় সেরেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। অন্যদিকে, ডেভেলপার কোম্পানি ‘সানমার’ পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ করলেও জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

নগরের বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় গেলে দেখা যায় পাহাড় দখলের এক মহোৎসব। সেখানে দৃশ্যমানভাবেই পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে বসতি, দোকান, মন্দির ও গির্জা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অসহায় মানুষদের আশ্রয়ের নামে প্রভাবশালী চক্র এই দখল প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। জামাল খান, পাহাড়তলী, আকবরশাহ ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকাতেও সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটা হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. খালেদ মেসবাহুজ্জামান এই পরিস্থিতিকে অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “পাহাড় হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার খুঁটি। এগুলো ধ্বংস হলে নগরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও উষ্ণতার মুখে পড়বে।”

এই ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি নগরবাসীর অসচেতনতা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। নগরের বেশিরভাগ খাল ও নালা এখন ময়লার ভাগাড় বা গার্বেজ স্টেশনে পরিণত হয়েছে। নগরবাসীই অসচেতনভাবে সেখানে ঘরের ময়লা, ইলেকট্রনিকস বর্জ্য ও পুরোনো কাপড়চোপড় ফেলছেন, যা পানি প্রবাহে মারাত্মক বাধার সৃষ্টি করছে।

আইনের প্রয়োগহীনতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান। তিনি বলেন, “পরিবেশ আইনের কার্যকারিতা নেই। মামলা হলেও চার্জশিট হয় না, রায় হয় না। পরিবেশ অধিদপ্তর বড়জোর ১ লাখ টাকা জরিমানা করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করে।”

এই বিষয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, পাহাড় রক্ষায় তারা গুরুত্ব দিচ্ছেন, তবে জনবলসংকটের কারণে অনেক কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতক্ষণ পর্যন্ত পাহাড় কাটা এবং খাল-নালা দখল বন্ধে সমন্বিত, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রামের মুক্তি প্রায় অসম্ভব। সামান্য জরিমানা বা মৌসুমি কিছু পদক্ষেপের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এই অপরাধের বিরুদ্ধে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন, অন্যথায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নগরীর ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার।