সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

অযত্ন-অবহেলায় ১৩২ বছরের ‘হাতির বাংলো’, বিবর্ণ হচ্ছে ঐতিহ্য

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি এলাকায় উঁচু পাহাড়ের শান্ত-ছায়া সুশীতল পরিবেশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৩২ বছরের পুরোনো ‘হাতির বাংলো’। শতাব্দীর প্রাচীন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি এখন বিবর্ণ ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

চারদিকে উঁচু পাহাড়ে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির কিচিরমিচির শব্দের কারণে স্থানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্র। বিকেল হলেই চট্টগ্রামের দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী এই ‘হাতির বাংলো’ দেখতে ছুটে আসেন। বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা সারাবছরই এর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী এবং চারপাশের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে জড়ো হন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ব্রাউনজারের অধীনে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সময় রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য ডুপ্লেক্স এই বাংলোটি নির্মাণ করা হয়। হাতির আদলে নির্মিত স্থাপনাটি সাধারণ মানুষের কাছে ‘হাতি বাংলো’ নামে পরিচিতি পায়। এর নির্মাণকাজে কোনো লোহা ব্যবহার না করে ফেরো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একে একটি বিশেষ স্থাপত্যিক মর্যাদা দিয়েছে।

হাতির আদলে নির্মিত এই ডুপ্লেক্স বাড়িটির সামনের দিকে বেরিয়ে থাকা বারান্দাটি দেখতে হাতির শুঁড়ের মতো, এবং এর দুপাশে থাকা দুটি গোলাকার ছিদ্রকে হাতির চোখের মতো মনে হয়। ভবনটির নিচতলায় চারটি ও দোতলায় একটি শয়নকক্ষ রয়েছে।

কিন্তু কালের বিবর্তনে বাংলোটি আজ বসবাসের প্রায় অযোগ্য। সরেজমিনে দেখা যায়, এর সবকটি দরজা-জানালাই ভেঙে পড়েছে এবং মরিচা ধরেছে। কাঠের জানালাগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, দেয়ালজুড়ে জমেছে শ্যাওলা এবং খসে পড়ছে পলেস্তারা। বাড়ির চারপাশজুড়ে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা আর শুকনো পাতা। নান্দনিক এই বাংলোতে এখন শুধু একজন রেলওয়ে কর্মচারী কোনোমতে একটি কক্ষে বসবাস করেন।

২০২৩ সালে রেলওয়ের পক্ষ থেকে একবার সংস্কার করা হলেও তা ছিল সামান্যই। বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী এই স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, “ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হাতির বাংলোটি রেলওয়ের একটি প্রাচীন ভবন এবং ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশ রেলওয়ের এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো আমরা সংরক্ষণ করে থাকি। এই ঐতিহ্যকেও সংরক্ষণ করা হবে।”

তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে এটি সংস্কার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এর রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা মনে করেন, দ্রুত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে হয়তো এই অনন্য স্থাপনাটিকে আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

অযত্ন-অবহেলায় ১৩২ বছরের ‘হাতির বাংলো’, বিবর্ণ হচ্ছে ঐতিহ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ জুলাই ২০২৫, ০৮:১৮

চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি এলাকায় উঁচু পাহাড়ের শান্ত-ছায়া সুশীতল পরিবেশে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১৩২ বছরের পুরোনো ‘হাতির বাংলো’। শতাব্দীর প্রাচীন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি তার স্থাপত্যশৈলী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি এখন বিবর্ণ ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

চারদিকে উঁচু পাহাড়ে চোখ জুড়ানো সবুজের সমারোহ আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির কিচিরমিচির শব্দের কারণে স্থানটি প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণের কেন্দ্র। বিকেল হলেই চট্টগ্রামের দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থী এই ‘হাতির বাংলো’ দেখতে ছুটে আসেন। বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষক, কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা সারাবছরই এর নান্দনিক স্থাপত্যশৈলী এবং চারপাশের প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে জড়ো হন।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দপ্তর ছিল চট্টগ্রামে। ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ব্রাউনজারের অধীনে চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সময় রেলওয়ে কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য ডুপ্লেক্স এই বাংলোটি নির্মাণ করা হয়। হাতির আদলে নির্মিত স্থাপনাটি সাধারণ মানুষের কাছে ‘হাতি বাংলো’ নামে পরিচিতি পায়। এর নির্মাণকাজে কোনো লোহা ব্যবহার না করে ফেরো সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছিল, যা একে একটি বিশেষ স্থাপত্যিক মর্যাদা দিয়েছে।

হাতির আদলে নির্মিত এই ডুপ্লেক্স বাড়িটির সামনের দিকে বেরিয়ে থাকা বারান্দাটি দেখতে হাতির শুঁড়ের মতো, এবং এর দুপাশে থাকা দুটি গোলাকার ছিদ্রকে হাতির চোখের মতো মনে হয়। ভবনটির নিচতলায় চারটি ও দোতলায় একটি শয়নকক্ষ রয়েছে।

কিন্তু কালের বিবর্তনে বাংলোটি আজ বসবাসের প্রায় অযোগ্য। সরেজমিনে দেখা যায়, এর সবকটি দরজা-জানালাই ভেঙে পড়েছে এবং মরিচা ধরেছে। কাঠের জানালাগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, দেয়ালজুড়ে জমেছে শ্যাওলা এবং খসে পড়ছে পলেস্তারা। বাড়ির চারপাশজুড়ে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা আর শুকনো পাতা। নান্দনিক এই বাংলোতে এখন শুধু একজন রেলওয়ে কর্মচারী কোনোমতে একটি কক্ষে বসবাস করেন।

২০২৩ সালে রেলওয়ের পক্ষ থেকে একবার সংস্কার করা হলেও তা ছিল সামান্যই। বড় ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী এই স্থাপনাটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) প্রকৌশলী মো. সবুক্তগীন বলেন, “ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হাতির বাংলোটি রেলওয়ের একটি প্রাচীন ভবন এবং ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশ রেলওয়ের এমন অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যেগুলো আমরা সংরক্ষণ করে থাকি। এই ঐতিহ্যকেও সংরক্ষণ করা হবে।”

তিনি জানান, বিভিন্ন সময়ে এটি সংস্কার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও এর রক্ষণাবেক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে দর্শনার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীরা মনে করেন, দ্রুত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না নিলে হয়তো এই অনন্য স্থাপনাটিকে আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না।