মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

আম কূটনীতি: ড. ইউনূসের হাঁড়িভাঙা কি দিল্লির মন গলাবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পাঠানো এক হাজার কেজি হাঁড়িভাঙা আমের বাক্স দিল্লির লোককল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ঠিকানায় পৌঁছেছে। ভারত-বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ‘তিক্ত’ সম্পর্কে ‘মিষ্টতা’ আনার একটি কূটনৈতিক চেষ্টা হিসেবেই এই উপহারকে দেখা হচ্ছে।

এই ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার বহু পুরোনো ‘আম কূটনীতির’ ঐতিহ্যকেই মনে করিয়ে দেয়, যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, রেষারেষি আর এমনকি রহস্যও।

হাসিনার দেখানো পথে ড. ইউনূস

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আম-প্রীতির কথা সুবিদিত। এই বিষয়টিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতি বছর গ্রীষ্মে তাকে আম উপহার পাঠাতেন। শুধু মোদীই নন, পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীরাও নিয়মিতই পেতেন বাংলাদেশের আমের ঝুড়ি। এমনকি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকেও আম পাঠিয়েছিলেন তিনি।

শেখ হাসিনার পতনের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন এই ‘আম কূটনীতির’ ধারা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু পর্যবেক্ষকদের অবাক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারও সেই পরম্পরা বজায় রাখল।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রিয়জিত দেবসরকারের মতে, “আমেরিকার দিক থেকে ট্যারিফের চাপ, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, মিয়ানমারের পরিস্থিতি–নানা কারণে বাংলাদেশ প্রবল চাপে আছে। এ কারণেই ড. ইউনূসকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে এই আম কূটনীতির পথে হাঁটতে হয়েছে বলে আমার ধারণা।”

ভারত-পাকিস্তানের ঐতিহাসিক ‘আম-যুদ্ধ’

আমকে কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ভারত ও পাকিস্তানে নতুন কিছু নয়। উভয় দেশেরই জাতীয় ফল আম। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পঞ্চাশের দশকে চীন সফরে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-কে দশেরি ও ল্যাংড়া আমের চারা উপহার দিয়েছিলেন। সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ ভারত সফরে এলে তাকেও পাঠিয়েছিলেন বিখ্যাত মালিহাবাদী আমের ঝুড়ি।

পাকিস্তানও এক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল না। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং-কে এক বাক্স আম উপহার দেন, যা চীনে অপরিচিত হওয়ায় মাও সেটি দেশের বিভিন্ন কারখানা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিলি করে দেন। চেয়ারম্যানের সেই উপহার নিয়ে চীনে যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল, তা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশ নিজেদের মধ্যে উত্তেজনা কমাতেও আমকে ব্যবহার করেছে। ১৯৮১ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়া উল-হক ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে আমের বাক্স পাঠান। পরবর্তীতে আসিফ আলি জারদারি এবং নওয়াজ শরিফও ভারতের প্রধানমন্ত্রীদের জন্য আম পাঠিয়েছেন, যদিও তা দুই দেশের সম্পর্কে স্থায়ী উষ্ণতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
আম রফতানিতে বড় লক্ষ্যমাত্রা, নতুন গন্তব্য চীন

বিশ্ববাজারে আমের কদর ও প্রতিযোগিতা

বিশ্বে আম রপ্তানিতে প্রথম তিনটি দেশ হলো ভারত, মেক্সিকো ও পাকিস্তান। বাংলাদেশও প্রথম দশের মধ্যেই রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, রপ্তানির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের কৌশল ভারতের চেয়ে বেশি সুচিন্তিত। বিদেশে নিয়মিত ‘আম উৎসব’ আয়োজন করে এবং নেতাদের উপহার দিয়ে তারা পাকিস্তানি আমের জন্য একটি শক্তিশালী বাজার তৈরি করেছে।

আম বিশেষজ্ঞ প্রতীপ কুমার দাশগুপ্তের মতে, রপ্তানির ক্ষেত্রে আমের ‘শেলফ লাইফ’ বা বেশিদিন ভালো থাকার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে সেখানকার আমে আঁশ কম এবং শেলফ লাইফ বেশি, যা পশ্চিমা বাজারে তাদের কদর বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ভারতের বেশিরভাগ সুস্বাদু আম দ্রুত পচনশীল হওয়ায় রপ্তানির জন্য কম উপযোগী।

রহস্যময় সেই ‘বিস্ফোরিত আমের বাক্স’

আমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক রহস্যও। ১৯৮৮ সালের ১৭ অগাস্ট পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া উল-হকের বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় আমের নাম জড়িয়ে আছে।

সেদিন বাহাওয়ালপুর থেকে ফেরার সময় তার বিমানে উপহার হিসেবে কিছু আমের বাক্স তোলা হয়েছিল। উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরেই বিমানটিতে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াসহ ৩১ জন যাত্রীই নিহত হন।

এই ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলোর মধ্যে একটি হলো—আমের বাক্সেই বোমা লুকানো ছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পাকিস্তানি লেখক মোহামেদ হানিফ তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘আ কেস অব এক্সপ্লোডিং ম্যাঙ্গোজ’ লিখেছিলেন।

সুতরাং, এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে আম কখনোই শুধু একটি ফল নয়, বরং ‘খাস’ বা বিশেষ এক কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবেই নিজের জায়গা করে নিয়েছে।

পাঠকপ্রিয়