সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এশীয় হাতির চলাচলের পথে (করিডর) নির্মিত দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে হাতির নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ সেন্সর ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। হাতির উপস্থিতি শনাক্ত করে চালককে সতর্ক করতেই এ ব্যবস্থা, যা চলন্ত ট্রেন থামিয়ে বন্যপ্রাণীটির জীবন রক্ষা করবে।
এই রেলপথে ইতোমধ্যে ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতির বাচ্চার মৃত্যু হয়েছে এবং অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে আরেকটি। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে আনা রোবোটিক ক্যামেরাগুলো চলতি বছরের মধ্যেই স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং এগুলো এখন দেশে আনার অপেক্ষায় আছে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে বর্তমানে দিনে ও রাতে চারটি ট্রেন চলাচল করে। ১০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথের প্রায় ২৭ কিলোমিটারই পড়েছে লোহাগাড়ার চুনতি, ফাঁসিয়াখালী ও মেধাকচ্ছপিয়া সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে। এই বন এশীয় হাতির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র চুনতি অভয়ারণ্যেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি হাতির বসবাস, যারা নিয়মিতই চলাচলের জন্য রেলপথ অতিক্রম করে। যদিও হাতির চলাচলের সুবিধার্থে রেললাইনের ওপর ওভারপাস এবং নিচে আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে, তবুও ঝুঁকি রয়েই গেছে।
রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক ও প্রকল্প পরিচালক মো. সবুক্তগীন বলেন, “সংরক্ষিত বনের ভেতরে ২৭ কিলোমিটার রেলপথে হাতির করিডর থাকায় ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। হাতিরা সেগুলো ব্যবহারও করে। তারপরও মাঝেমধ্যে রেললাইনে চলে আসে। দুর্ঘটনা এড়াতেই আমরা ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নিয়েছি।”
যেভাবে কাজ করবে ক্যামেরা
প্রকল্প পরিচালক জানান, ক্যামেরাগুলো হাতির অবয়ব শনাক্ত করতে সক্ষম। রেললাইনে হাতি বা হাতির পাল চলে এলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তুলে সিগন্যাল বা সংকেত পাঠাবে। এই সংকেত পেয়েই রেললাইনের পাশের লাল বাতি জ্বলে উঠবে, যা দেখে ট্রেনের চালক (লোকোমাস্টার) বিপদের আঁচ পেয়ে গতি কমাবেন বা ট্রেন থামিয়ে দেবেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ছয়টি ক্যামেরা ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম স্থাপনে প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে ট্রেনচালক ও পরিচালকদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে।
রেললাইনে একের পর এক দুর্ঘটনা
আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন চালুর আগেই গত বছরের ১৩ অক্টোবর রাতে চুনতি এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় একটি বাচ্চা হাতির মৃত্যু হয়।
একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল গত ২২ জুলাই। রাত ১০টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামগামী সৈকত এক্সপ্রেসের লোকোমাস্টার আবদুল আওয়াল দূর থেকে রেললাইনে হাতি দেখতে পেয়ে হার্ড ব্রেক করে ট্রেনটি থামিয়ে দেন। এতে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় হাতিটি।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উপ-বন সংরক্ষক আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ রেলওয়ের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “হাতি রক্ষায় এ ধরনের সেন্সর বসানোর জন্য আমরা রেলওয়েকে অনেক আগে থেকেই বলে আসছি। এখন যদি তা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে খুবই ভালো একটি উদ্যোগ হবে।”