নয় বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং ৮৩৮ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির পর অবশেষে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। সফলভাবে পরীক্ষামূলক সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ায় আগামীকাল শনিবার এই যুগান্তকারী প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খাতে বছরে প্রায় ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় ঢাকা বিভাগে। এই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেল, প্রথমে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নদীপথে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ও ফতুল্লা ডিপোতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে সড়কপথে ট্যাংকারে করে তা ঢাকায় সরবরাহ করা হয়। এই জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় প্রতি মাসে প্রায় ১৫০টি জাহাজ ব্যবহার করতে হয় এবং বছরে খরচ হয় প্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি। পাইপলাইন চালু হলে এই দীর্ঘসূত্রিতা, পরিবহন ঝুঁকি এবং অর্থের অপচয় বহুলাংশে কমে আসবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, গত ২২ জুন থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে পাইপলাইনে প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখ লিটার ডিজেল সফলভাবে সরবরাহ করা হয়েছে, এতে তেমন কোনো ত্রুটি ধরা পড়েনি। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আগামীকাল এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, এই পাইপলাইন দিয়ে বছরে সর্বোচ্চ ২৭ লাখ টন বা ৩১৭ কোটি লিটার ডিজেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল হক জানান, বর্তমানে নৌ ও সড়কপথে জ্বালানি পরিবহনে বছরে যে ৩২৬ কোটি টাকা খরচ হয়, পাইপলাইন চালুর পর তা আর লাগবে না। তবে পাইপলাইনটির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণে বছরে প্রায় ৯০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এতে রাষ্ট্রের নিট সাশ্রয় হবে বছরে ২৩৬ কোটি টাকা।
২০১৬ সালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এটি বাস্তবায়ন করে। ২০২০ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে চলতি বছরের মার্চে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ২ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা ধরা হলেও করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ থেকে সরঞ্জাম আমদানিতে বিলম্ব এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে চূড়ান্ত ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান বলেন, এই পাইপলাইনের মাধ্যমে সহজে, নিরাপদে ও সাশ্রয়ীভাবে তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে। এতে কেবল সময় ও অর্থেরই সাশ্রয় হবে না, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জ্বালানির অপচয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।