মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

লুট হওয়া অস্ত্রেই একের পর এক অপরাধ

পুলিশের লুট হওয়া ১৩ শতাধিক অস্ত্র অপরাধীদের হাতে, ৭ শতাধিক বন্দি এখনও নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া দেড় হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার করা যায়নি, যেগুলো এখন অপরাধীদের হাতে চলে গেছে বলে আশঙ্কা করছে পুলিশ।

এসব অস্ত্র ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের মতো ঘটনা ঘটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কারাগার থেকে পালানো সাত শতাধিক বন্দি, যাদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও জঙ্গি আসামিও রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই পরিস্থিতিকে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান ও কাঁদানে গ্যাস লঞ্চারসহ মোট ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং প্রায় সাড়ে ছয় লাখ গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে চলতি বছরের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৯০টি অস্ত্র ও প্রায় চার লাখ গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও ১ হাজার ৩৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪০ জন বন্দি পালিয়ে যায় এবং ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট হয়। কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, পলাতক বন্দিদের মধ্যে ৭২১ জন এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, যাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ৯ জন জঙ্গি রয়েছে। কারাগারের লুট হওয়া ২০টি অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি বলে তিনি জানান।

উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্র এরই মধ্যে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হওয়ার একাধিক নজির পাওয়া গেছে। গত মে মাসে চট্টগ্রামে মো. পারভেজ ও রিয়াজুর রহমানকে পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া একটি রিভলবারসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এপ্রিলে খুলনায় ‘বিডি পুলিশ’ লেখা একটি শটগানসহ ফারুক হোসেন ও খাইরুল সরদার নামে দুজন এবং চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রসহ আরিফ হোসেন নামে আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

গত ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম নামে এক ব্যক্তিকে একটি পিস্তলসহ গ্রেপ্তার করা হয়, যেটি পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হয়েছিল বলে জানান চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া। এর দুদিন আগে ১৭ জুন চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তলসহ কাভার্ড ভ্যানচালক মো. রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর মুন্সিগঞ্জে শাহিদা আক্তার নামে এক তরুণীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ৩ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে মোহাম্মদ নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ সালেক নামে দুই ব্যক্তি নিহত হন। চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম তখন জানান, নিহত নেজামের পিস্তলের গুলিতে চারজন আহত হয়েছিলেন এবং পিস্তলটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হয়েছিল। তবে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী নিহত দুজনকে নিজেদের কর্মী দাবি করে বলেছিল, সালিসের কথা বলে ডেকে নিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্রের বেশির ভাগই উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার না হওয়া অস্ত্র-গুলি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এগুলো উদ্ধারে অভিযান চলছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা নেই।”

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ায় খুনখারাবি, ছিনতাই, ডাকাতি বেড়েই চলছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তা উদ্ধার এবং জেল পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা না গেলে নির্বাচন সুষ্ঠু করা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।”

পাঠকপ্রিয়