মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

বহুজাতিকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দেশীয় কোমল পানীয়র ব্র্যান্ড

দেশীয় ব্র্যান্ডের উত্থান, ৯ হাজার কোটি টাকার কোমল পানীয়র বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শহরায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান চাহিদার ওপর ভর করে বাংলাদেশে কোমল পানীয়র বাজার ৯ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পেপসিকো ও কোকা-কোলার মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেঘনা, প্রাণ ও আকিজের মতো দেশীয় কোম্পানিগুলোও বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০৩২ সালের মধ্যে এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জার্নাল অব বিজনেস স্টাডিজ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০১০-এর দশকে দেশের কার্বোনেটেড কোমল পানীয়র বাজার ছিল প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার, যা ২০১১ সালেই ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ১,৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে শুধু কার্বোনেটেড পানীয়র বাজারই সাড়ে আট থেকে ৯ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে দুটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও গত এক দশকে বেশ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই খাতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে এসেছে। এর মধ্যে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের বেভারেজ ইউনিট অন্যতম।

মেঘনা গ্রুপের সিনিয়র এজিএম (ব্র্যান্ড) মুনতাসির মামুন বলেন, “২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করে মেঘনা বেভারেজ লিমিটেড দেশের বাজারে বৈচিত্র্য নিয়ে এসেছে। আমাদের ‘ফ্রেশ কোলা’ ক্লাসিক স্বাদ, ‘ফ্রেশ আপ’ লেবুর সতেজতা, ‘ফ্রেশ গুগলি’ আসল কমলার স্বাদ এবং ‘ফ্রেশ মাজেন্ডা’ তেঁতুলের টক-ঝাল স্বাদের অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। এছাড়া লেবু ও পুদিনার মিশ্রণে ‘ফ্রেশ মহিতো’ ভোক্তাদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।”

একইভাবে আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম বলেন, “ভোক্তাদের আগ্রহ ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক নতুন পণ্য বাজারে আসছে, যা গত এক যুগে সামগ্রিক বিক্রির হার অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।”

বাংলাদেশে কোমল পানীয়র বাজারে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোকা-কোলার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৬৫ সালে এবং পেপসিকোর যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৬ সালে। ট্রান্সকম বেভারেজ লিমিটেড পেপসিকোর ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে পেপসি, সেভেনআপ, মিরিন্ডা ও মাউন্টেন ডিউয়ের মতো ব্র্যান্ডগুলো বাজারজাত করছে। গাজীপুর ও চট্টগ্রামে তাদের তিনটি উৎপাদনকেন্দ্র রয়েছে।

কোমল পানীয়র বাজারের বড় ভোক্তা তরুণ জনগোষ্ঠী। ‘পিএলওএস গ্লোবাল পাবলিক হেলথ’-এর এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৪৪ শতাংশের বেশি কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন কার্বোনেটেড পানীয় গ্রহণ করে।

দেশীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কোমল পানীয় এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবজারভেটরি অব ইকোনমিক কমপ্লেক্সিটির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ভারত, ফিলিপাইন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে ৪৩.৫ মিলিয়ন ডলারের পানীয় রপ্তানি হয়েছে।

বাংলাদেশ বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিবিএমএ) সাধারণ সম্পাদক মেজর (অব.) কে এম এ এ রাশেদ আল আরেফিন বলেন, “বাংলাদেশের বেভারেজ শিল্প দ্রুত বর্ধনশীল একটি খাত। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাজারে থাকলেও এখন দেশীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ড বেশ ভালো করছে। গ্রাহকদের পছন্দের ওপর ভিত্তি করে সুগার-ফ্রি ও লো-ক্যালরির মতো নতুন নতুন পানীয়ও বাজারে আসছে।”

কোমল পানীয়র ইতিহাস বেশ প্রাচীন। খ্রিষ্টপূর্ব যুগে মানুষ প্রাকৃতিক ঝরনার গ্যাসযুক্ত পানি পান করত, যা ঔষধি গুণসম্পন্ন বলে মনে করা হতো। তবে আধুনিক কোমল পানীয়র সূচনা হয় ১৭৬৭ সালে, যখন ইংরেজ বিজ্ঞানী জোসেফ প্রিস্টলি কৃত্রিমভাবে পানিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড মেশানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এরপর ১৮৮৬ সালে আটলান্টার ফার্মাসিস্ট জন পেম্বারটন কোকো পাতা ও কোলা ফলের নির্যাস ব্যবহার করে যে বিশেষ সিরাপ তৈরি করেন, তা-ই আজকের ‘কোকাকোলা’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।

পাঠকপ্রিয়