সরকারের ক্ষতিপূরণ তহবিল থাকলেও জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ৯৫ শতাংশেরও বেশি সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া, এ বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতার অভাবও অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৩১,৯০৪ জন হতাহত হলেও ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ১,৪৭১ জন বা তাদের পরিবার। অর্থাৎ, সরকারি গণনা অনুযায়ী ভুক্তভোগীদের মাত্র ৫ শতাংশেরও কম এই সুবিধার আওতায় এসেছেন।
এই সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে মোট ৬৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার হার কিছুটা বেড়েছে। গত তিন মাসে ৩৫২ জন ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, যেখানে এর আগের ২৮ মাসে এই সংখ্যা ছিল ১,১১৯ জন।
এ অবস্থায় আবেদনের সময়সীমা ৩০ দিন থেকে বাড়িয়ে দুই মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান।
জটিলতা কোথায়
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর অধীনে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া শুরু হয়। আইন অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবারকে এককালীন ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। অঙ্গহানি বা গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গু হলে ৩ লাখ এবং চিকিৎসার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা থাকলে ১ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ পেতে দুর্ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্র, মৃত্যু সনদ, উত্তরাধিকার সনদ, ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে উত্তরাধিকারীদের দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নিসহ অন্তত ছয় ধরনের নথি জমা দিতে হয়। আহতদের ক্ষেত্রেও পরিচয়পত্র এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সব কাগজপত্র জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, “এতসব কাগজপত্র জোগাড় করতে এক মাস যথেষ্ট সময় নয়। এই জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই আবেদন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকেই এই সরকারি প্রকল্প সম্পর্কে জানেন না। আবার কিছু পরিবার লাশ ময়নাতদন্ত করতে রাজি হয় না, যার ফলে তারা ক্ষতিপূরণের জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন।”
বাড়ছে সময়সীমা
যোগাযোগ করা হলে বিআরটিএ চেয়ারম্যান এবং ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, গত ১২ অগাস্ট বোর্ডের সভায় আবেদনের সময়সীমা বাড়িয়ে দুই মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনুমোদনের জন্য ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠানো হয়েছে।”
তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আবেদন পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন এবং ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিআরটিএ কর্মকর্তাও এই দীর্ঘসূত্রতার কথা স্বীকার করে বলেন, “কাগজপত্র যাচাই করতে অনেক সময় লাগে, যা আবেদন নিষ্পত্তিতে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ।”
তবে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মমতাজ বলেন, “আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো দেরি করি না। আইন অনুযায়ী আমাদের সব নথি যাচাই করতে হয় এবং এতে সময় লাগে।”
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাউজুল কবির খান বলেন, “মানুষকে সচেতন করতে আমরা কাজ করছি। প্রক্রিয়াটি সহজ করার জন্যও আমরা কাজ করব, যাতে মানুষ সহজেই ক্ষতিপূরণ পেতে পারে।”