সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নামে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি, না দিলে মিলছে এলোপাতাড়ি গুলি। নগর ও জেলার পাঁচ থানায় তাঁর বাহিনীর কারণে আতঙ্কে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ।

বিদেশে বসে সাজ্জাদের ফোন, চাঁদা না দিলেই গুলি, আতঙ্কে চট্টগ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম নগরের কালুরঘাট এলাকার বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনুসের জীবন গত ১ আগস্ট রাতের পর থেকে বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে। এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ২৩ জুলাই, একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে নিজেকে ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ হিসেবে পরিচয় দিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।

বিদেশে বসে দেওয়া সেই হুমকি অনুযায়ী টাকা দিতে পারেননি ইউনুস। ফলস্বরূপ, ১ আগস্ট রাতে একদল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী তাঁর বাসায় হামলা চালায়। একজন সন্ত্রাসী চিৎকার করে বলে, ‘সাজ্জাদ ভাইয়ের কথা ভালো লাগে নাই, এবার কবরে যা।’ এরপরই শুরু হয় এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ। হাঁটু, কোমরসহ শরীরের চারটি স্থানে গুলিবিদ্ধ হলেও সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান তিনি।

ঘটনার পর থেকে তীব্র আতঙ্কে থাকা ইউনুস বলেন, ‘যেভাবে গুলি করা হয়, ভাবিনি বাঁচব। এখনো বেঁচে আছি বলে মনে হয় না। সাজ্জাদ বিদেশে বসে দেশে এসব করার সাহস কীভাবে পায়? তার সহযোগীরা এত অস্ত্রই বা কোথা থেকে পায়?’

শুধু ইউনুসই নন, চট্টগ্রামের অপরাধজগৎ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে বিদেশে পলাতক এই শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর নির্দেশে চাঁদাবাজি, গুলি ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তাঁর অনুসারীরা। নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী ও রাউজানে সাজ্জাদ বাহিনীর কারণে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

যেভাবে চলছে অপরাধের নেটওয়ার্ক

একসময়ের শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত বড় সাজ্জাদ বর্তমানে ভারতেই অবস্থান করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ এক ডজন মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ পুলিশ তাঁকে ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা চায় এবং তাঁর বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি হয়। সে বছরের নভেম্বরে ভারতের পাঞ্জাব থেকে তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু দফায় দফায় চেষ্টা ও ২০১৭ সালে মামলার নথি পাঠিয়েও তাঁকে দেশে ফেরাতে ব্যর্থ হয় সরকার। দিল্লির তিহার কারাগারে কয়েক বছর জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে তিনি আবার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছেন।

সাজ্জাদের মূল সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ৫০ জনের একটি বাহিনী দিয়ে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতো। যদিও গত ১৫ মার্চ ছোট সাজ্জাদ কারাগারে গেছেন, কিন্তু সন্ত্রাসী তৎপরতা থেমে নেই। পুলিশ জানায়, ছোট সাজ্জাদের পর এখন বাহিনীর নেতৃত্বে এসেছে ১৩ মামলার আসামি রায়হান। এ ছাড়া খোরশেদ, মোবারক, ববি, কামাল, হাসানসহ অন্তত ২৫ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে, যারা অস্ত্র চালনায় পারদর্শী এবং বিদেশ থেকে বড় সাজ্জাদের নির্দেশ পালন করে।

সাম্প্রতিক আরও ঘটনা

গত ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে আবাসন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতেও একইভাবে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। তাঁর কাছেও ১৫ দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দেওয়ায় তাঁর বাড়িতে গুলি করে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়, ‘এবার বাড়িতে গুলি করেছি, এরপর শেষ করে দেব।’

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ঘটনায় জড়িত সাজ্জাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

সন্ত্রাসী সাজ্জাদের উত্থান

নগরের বায়েজিদ এলাকার সাজ্জাদ আলী অপরাধজগতে পরিচিতি পান ১৯৯৯ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর লিয়াকত আলী খানকে হত্যার অভিযোগের মাধ্যমে, যদিও সাক্ষীর অভাবে তিনি খালাস পান। তবে তাঁর নাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ২০০০ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটে ছাত্রলীগের ছয় নেতা-কর্মীসহ আটজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যার মধ্য দিয়ে। ‘এইট মার্ডার’ নামে পরিচিত সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা হিসেবে তাঁর নাম আসে। ২০০৪ সালে জামিনে বেরিয়ে তিনি বিদেশে পালিয়ে যান।

এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর বাহিনীর হাতে আরও একাধিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে যুবদল কর্মী ইব্রাহিম হত্যা, মো. আনিস ও কায়সার হত্যা এবং ঢাকাইয়া আকবরকে হত্যার মতো ঘটনাও রয়েছে।

নগর পুলিশের সদ্য বদলি হওয়া অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মাহমুদা বেগম জানান, সাজ্জাদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সাথে যোগাযোগসহ সব ধরনের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে পুলিশের সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে বিদেশে বসেই চট্টগ্রামের বুকে আতঙ্ক ছড়িয়ে যাচ্ছেন এই শীর্ষ সন্ত্রাসী।

পাঠকপ্রিয়