সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

চট্টগ্রামে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য: গুলি-খুনের ঘটনায় আতঙ্ক, আসামি অধরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও দখলকে কেন্দ্র করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড লাগামহীন হয়ে পড়েছে। চাঁদা না পেয়ে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মেকানিককেও গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা করতে দ্বিধা করছে না সন্ত্রাসীরা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের অনেকে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমনকি হত্যা মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরাও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ভয়ে অনেকে পুলিশের কাছে অভিযোগ পর্যন্ত দায়ের করছেন না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি তৎপরতা কমে যাওয়ায় অপরাধীরা সেই সুযোগ নিচ্ছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) গত ২৪ আগস্ট ‘হ্যালো সিএমপি’ অ্যাপে নগরবাসীকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানায়। এরপর ১১ দিনে ৭৪টি অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর তদন্ত এখনো শুরু হয়নি বলে জানা গেছে।

চাঁদার জন্য গুলি ও খুন

গত ৮ সেপ্টেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানাধীন শান্তিনগর এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন গ্যারেজ মালিক শাহজাহান মিয়া ওরফে সাজন (৩৫)। স্থানীয়দের বরাতে জানা যায়, তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।

এর আগে, গত ১ আগস্ট রাতে নগরীর চান্দগাঁওয়ের মোহরা এলাকায় বালু ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইউনূসের বাসায় ঢুকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। তার হাঁটু, কোমরসহ শরীরে চারটি গুলি লাগে, তবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। অভিযোগ রয়েছে, ২৩ জুলাই বিদেশ থেকে সাজ্জাদ আলী ওরফে ‘বড় সাজ্জাদ’ নামে এক সন্ত্রাসী হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ইউনূসের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল।

চট্টগ্রামে এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় শটগান হাতে নিয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে ঢুকে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ‘ছোট সাজ্জাদ’ ও তার সহযোগীরা।

আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও খুনের ঘটনা ঘটছে। গত বছরের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁওয়ের শমশেরপাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে আফতাব উদ্দিন তাহসিন (২৬) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায়, সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ও বাবলা গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ নগরীর বাকলিয়ার এক্সেস রোডে প্রাইভেটকারে থাকা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করা হয় বখতিয়ার হোসেন ও আবদুল্লাহ নামে দুই ব্যক্তিকে, যারা বাবলা গ্রুপের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। ওই গাড়িতে বাবলা থাকলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।

প্রকাশ্যে ঘুরছে পরোয়ানাভুক্ত আসামি

গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁওয়ের পাঠানিয়া গোদা এলাকায় সিটি করপোরেশনের একটি টার্ফ মাঠ দখল নিয়ে প্রকাশ্যে জুবায়ের উদ্দিন বাবু (২৬) নামে এক যুবককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়।

এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির কৃষিবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমিন এবং চান্দগাঁও থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. আলফাজসহ ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়। আসামিদের অনেকে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিলেও পরে নিম্ন আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়।

এরপরও অন্যতম আসামি আলফাজসহ অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১৩ জুলাই আলফাজের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অথচ এর পরেও তাকে এলাকায় বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, ২৯ আগস্ট আলফাজকে তার চান্দগাঁওয়ের বাসা থেকে বের হতে দেখা যায়। পরদিন একটি রেস্টুরেন্টে এবং সম্প্রতি তাকে বরিশাল বাজারেও দেখা গেছে।

আলফাজের বিরুদ্ধে ২০১৩ সালে সৎবোনকে হত্যার অভিযোগেও মামলা হয়েছিল, যার অভিযোগপত্র ২০১৬ সালে আদালতে জমা দেয় পুলিশ।

জুবায়ের হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই জায়েদ আবদুল্লাহ বিন ছরওয়ার বলেন, “বাদীর সহযোগিতা না পাওয়ায় সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

পুলিশের বক্তব্য

‘হ্যালো সিএমপি’ অ্যাপে জমা পড়া অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপির এডিসি (পিআর) শ্রীমা চাকমা বলেন, “অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন।”

গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিদের প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, “পুলিশের কাছে অপরাধীর কোনো ভিন্ন পরিচয় নেই। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি যে দলেরই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।”

পাঠকপ্রিয়