সোমবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

‘আনাসের চিঠি’র শপথ নিয়ে মাঠে নামছেন ৬৪ জেলার নতুন এসপি

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর রাজারবাগের বাতাসে এখন পরিবর্তনের আভাষ, নাকি আসন্ন ঝড়ের পূর্বপ্রস্তুতি? সদ্য নিয়োগ পাওয়া ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) কপালে চিন্তার ভাঁজ। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যেটিকে কেবল একটি ভোটযুদ্ধ নয়, বরং ‘নতুন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৃহস্পতিবার দিনভর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে রাজারবাগের পুলিশ সদর দপ্তর পর্যন্ত চলা ম্যারাথন বৈঠকে উঠে এসেছে আগামী নির্বাচনের রূপরেখা, যেখানে ব্যালটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে দেখা হচ্ছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ হিসেবে।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ড. ইউনূস পুলিশ কর্মকর্তাদের এক ঐতিহাসিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, এই নির্বাচন কোনো রুটিন মাফিক কর্মযজ্ঞ নয়; এটি গণ-অভ্যুত্থানের রক্তস্নাত পথ বেয়ে আসা এক স্বপ্নপূরণের সুযোগ। পুলিশ সুপারদের তিনি তুলনা করেছেন ‘ধাত্রী’র সঙ্গে। একটি শিশুর জন্ম যেমন ধাত্রীর নিপুণ হাতে নিরাপদ থাকে, তেমনি আগামীর বাংলাদেশও নির্ভর করছে এই কর্মকর্তাদের পেশাদারিত্বের ওপর। দায়িত্বের ভার বোঝাতে গিয়ে তিনি টেনে আনেন গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের প্রসঙ্গ। আবেগমথিত কণ্ঠে তিনি পরামর্শ দেন, কর্মস্থলে যাওয়ার আগে যেন প্রত্যেকে আনাসের সেই চিঠিটি পাঠ করেন। সেই চিঠির প্রতিটি শব্দই হবে তাদের দায়িত্ব ও বিবেকের অতন্দ্র প্রহরী।

তবে আবেগের পাশাপাশি বাস্তবতার জমিনও বেশ কঠিন। রাজারবাগের পুলিশ অডিটরিয়ামে আইজিপি বাহারুল আলমের সঙ্গে বৈঠকে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা অকপটে তুলে ধরেন তাদের শঙ্কার কথা। তাদের মতে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে ‘ব্যালটের নিরাপত্তা’। অতীতের মতো ব্যালট ছিনতাই বা রাতের ভোটের কলঙ্ক যেন আর না লাগে, সেটিই এখন বড় মাথাব্যথা।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইজিপি বাহারুল আলম বাতলে দিয়েছেন ‘সফট পাওয়ার’ ও ‘হার্ড পাওয়ার’ এর সংমিশ্রণ। একদিকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন প্রতিটি সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার, যাতে আস্থার সংকট তৈরি না হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, সব প্রার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখলে সংঘাতের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে। অন্যদিকে, নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছেন। ঢাকা রেঞ্জের একজন এসপি জানান, সহিংসতা এড়াতে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করাকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন বলে সদর দপ্তর মনে করে।

হবিগঞ্জের এসপি ইয়াসমিন খাতুন জানিয়েছেন, বৈঠকে তারা মাঠপর্যায়ের কিছু সুনির্দিষ্ট সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। ভোটার, ভোট এবং ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে আইজিপির কাছ থেকে তারা পেয়েছেন সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও দিকনির্দেশনা। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক জেলার এসপি জানান, পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ও প্রশিক্ষিত করার নির্দেশনাও এসেছে শীর্ষ পর্যায় থেকে।

অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর প্রসঙ্গ টেনে ড. ইউনূস স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এবার সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ এসেছে। পক্ষপাতহীনতা নিশ্চিত করতেই এবার এসপিদের পদায়নে লটারির মতো অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। ব্যক্তিগত অসুবিধা হলেও জাতীয় স্বার্থে এই দায়িত্ব পালনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। বিশ্ব যেন বলতে পারে বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে—এটাই বর্তমান সরকারের লক্ষ্য।

এখন দেখার বিষয়, লটারির মাধ্যমে পোস্টিং পাওয়া এই কর্মকর্তারা কি পারবেন প্রধান উপদেষ্টার ‘ধাত্রী’ রূপকটিকে সার্থক করতে? নাকি ব্যালটের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে হোঁচট খাবেন পুরনো রাজনীতির জটিল সমীকরণে? সময় গড়াচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে এই ৬৪ জন পুলিশ সুপারের ওপর ন্যস্ত ইতিহাসের দায়ভার।

পাঠকপ্রিয়