গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে ঘটে গেছে বিস্ময়কর লোপাটের ঘটনা, যা হাজার হাজার কোটি টাকার সমান। এই সময়কালে ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাংক পরিচালকদের অনেকেই লুটপাটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জনগণের আমানতের টাকা ঋণের নামে বিদেশে পাচার করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনআরবিসি, বেসিক, সোনালী, সাউথ ইস্ট ও পদ্মা ব্যাংকের প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেনি।
দুদক ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যাংক থেকে লোপাটকৃত অর্থের মামলাগুলো দায়সারা হয়ে গেছে। দুদকের কর্মকর্তারা জানান, সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমর্থনে লোপাটকারীরা অভিযুক্ত হওয়ার পরও দায়মুক্তি পেয়ে গেছেন। ব্যাংকিং খাতে একাধিক বৃহৎ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশের পরও দুদক বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এমন অরাজকতার ফলে সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঋণ গ্রহণের নামে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের অর্থ লোপাট করে নিয়ে গেছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। ব্যাংক মালিক ও পরিচালকদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের কারণে লোপাটের এমন ঘটনা বাড়ছে, যা সাধারণ গ্রাহকের আমানতের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করছে।
দুদক বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সফলতা অর্জন করতে পারেনি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) অভিযোগ করেছে যে দুদকের কার্যক্রম প্রায়ই দায়সারা ও লোক দেখানো ধরনের। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে দুদক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহ। টিআইবি বলছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য দুদক, সিআইডি, বিএফআইইউ এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
বেসিক ব্যাংকের ঢাকার তিনটি শাখা থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লোপাটের ঘটনা ব্যাপক আলোচিত। ২০০৯ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ব্যাংকটির গুলশান, শান্তিনগর ও দিলকুশা শাখা থেকে এই ঋণ দেওয়ার তথ্য-প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রচারিত হলেও, প্রধান দোষীদের অনেকেই মুক্ত রয়ে গেছে। অপরদিকে, সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপ প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে, যা ব্যাংকিং খাতে অন্যতম বৃহৎ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত।
বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) অর্থ পাচারকারীদের ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাই লোপাটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশেষজ্ঞরা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার কারণে অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সহায়তা করেছেন এই লোপাটে, যা জনগণের সম্পদকে আরও ঝুঁকিতে ফেলেছে।
পদ্মা ব্যাংকের সাবেক ফার্মার্স ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। দুদক এই ঘটনার তদন্ত করে মামলা করলেও প্রধান অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বিসমিল্লাহ গ্রুপ জনতা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তদন্তের দায়সারা পদক্ষেপে আসামিদের অনেকেই ছাড় পেয়েছেন।
ব্যাংকিং খাতের এই বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাটকারীদের আইনের আওতায় আনতে দুদককে যথেষ্ট উদ্যোগী হতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধারের জন্য দায়িত্বশীল একটি নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, লোপাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং লোপাটকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সুসংহত এবং কার্যকরী পদক্ষেপ অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদকের কাজ সবসময়ই দায়সারা ও লোকদেখানো। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে দুদক কিছু করতে পারে না বা করার সৎ সাহস দেখায় না – সাধারণ মানুষ, গণমাধ্যম ও আমাদের এই ধারণা পটপরিবর্তনের পর দুদক নিজেই দুটি আঙ্গিকে প্রমাণ করছে। প্রথমত, দুদক এখন আওয়ামী লীগের সাবেক যেসব মন্ত্রী-এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অনুসন্ধান শুরু করছে তাদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ আগে থাকার পরও কিছু করেনি।’
‘যেমন আমরা সাবেক ভূমিমন্ত্রীর যুক্তরাজ্যে অর্থ পাচারের প্রমাণসহ তথ্য দুদকে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা তখন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একই তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এখন তৎপরতা দেখাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ সরকারে বিরাগভাজন ও বিরোধী শক্তি হিসেবে পরিচিত যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল তারা আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভবনা তৈরি হওয়ায় তাদের মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে দুদক, সিআইডি, বিএফআইইউ ও অ্যার্টনি জেনারেল অফিসের সমন্বিত প্রক্রিয়া এখনই শুরু করা উচিত। এক্ষেত্রে দুদকের যে ভূমিকা পালন করার কথা সেটাও আমরা দেখছি না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাচারের অর্থ ফেরানোর আশা আমরা করতেই পারি। তবে এই দুদক-সিআইডি-বিএফআইইউ দিয়ে তা হবে না। এগুলোর আমূল পরিবর্তন করতে হবে।’
এই বিষয়ে দুদক কমিশনার জহুরুল হক বলেন, ব্যাংকের অর্থ লোপাট ও পাচারের একাধিক ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একটি ঘটনায় পাচার হওয়া অর্থ ফেরতও আনা হয়েছে। এখনো অনেক আলোচিত বেশ কয়েকজন অর্থ লোপটকারীর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান। বিদেশে পাচার করা অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াও চলছে।