বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক পর্বে, বাংলাদেশের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। এর পর বিজয় মিছিলে যোগ দেয় হাজারো জনতা। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মনিরুজ্জামান মিলন (৩০)। মিছিলের উত্তেজনায় অংশ নেওয়া মিলন আর ফিরে আসেননি।
মিলনের বৃদ্ধা মা, মেরিনা বেগম জানেন না তার ছেলে কোথায়। স্বামীহীন সুবিতা খাতুন কাঁদছেন, ছেলে মানসুরাকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তারা সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছেন, তাদের জানার অধিকার আছে—মিলনের কী পরিণতি হয়েছে। তারা জানেন না, শহীদ হওয়ার স্বীকৃতি পাবেন কি না, কিন্তু তারা জানেন, মিলনের খোঁজ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
মিলনের মা মেরিনা বেগম, যখনই ছেলের নাম শোনেন, তখনই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে শান্ত করতে পারেন না কেউ। পুরো পরিবার জানে, মিলন আর বেঁচে নেই। তাদের মনেও মিলন ফিরে আসবে—এমন আশা নেই।
মিলনের বাড়ি বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের জোড়গাছা গ্রামে। তার বাবা, সুরুজ্জামান আগেই মারা গেছেন।
মিলন ঢাকা থেকে মেকানিকের ওপর ডিপ্লোমা শেষ করার পর ২০১৪ সালে চাকরিতে যোগ দেন। ২০২১ সালে বিয়ে করেন, এবং ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই সাভারের আশুলিয়া ইপিজেডে সিনিয়র মেকানিক হিসেবে যোগ দেন।
মিলনের স্ত্রী, সুবিতা খাতুন জানান, তার স্বামীকে শেষবার ৫ আগস্ট দুপুরে ফোনে কথা বলেছিলেন। সে সময় আশুলিয়া এলাকায় আনন্দ মিছিল চলছিল। তাকে সাবধানে থাকার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু এর আধাঘণ্টা পর মিলনের ফোন বন্ধ হয়ে যায়, আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
মিলনের মা জানিয়েছেন, “সে মিছিলে যাওয়ার আগে আমাকে ফোন করেছিল, আমি তাকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু সে আমাকে শুনল না, মিছিলে গেল। এরপর আর সে ফিরে আসেনি।”
জানা গেছে, ৫ আগস্টের দিন আশুলিয়া ও সাভার এলাকায় ৪৬ জন প্রাণ হারায় এবং অনেকেই নিখোঁজ হন। নিহতদের মধ্যে ১১ জনের লাশ পুলিশ পিকআপে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। মিলনের পরিবারের ধারণা, তাকে হত্যা করে তার লাশ গুম করা হয়েছে।
সুবিতা খাতুন বলেন, “৫ আগস্ট বিকেল ৩টা পর্যন্ত আমার স্বামীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারপর থেকেই তার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। যদি তাকে মিছিলে না যেতে বলতাম, তাহলে হয়তো তাকে হারাতে হতো না। আমার স্বামীর কী হয়েছে, এটা জানার অধিকার আমার রয়েছে। তাকে খুঁজে বের করার জন্য আমি সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি। না পেলে, আমার স্বামীকে শহীদের স্বীকৃতি দিন।”
মিলনের বড় ভাই, সামিউল ইসলাম মিল্টন, কলেজ শিক্ষক, বলেন, “ঘটনার দিন রাত ৯টার পর থেকে তার ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর হাসপাতাল, মর্গ, থানায় অনেক খোঁজ করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।” তিনি জানান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালসহ সব বড় হাসপাতালে খোঁজা হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল মেলেনি।
মিলনের খোঁজে ১১ ও ২১ আগস্ট সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আশুলিয়া থানায় তাদের অভিযোগ গ্রহণ করা হলেও, পরে কোনো জিডি নম্বর কিংবা সিল-স্বাক্ষর দেয়নি পুলিশ।
এদিকে, মিলনের পরিবারকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, শাহরিয়ার রহমান।
মিলনের পরিবারের অশ্রু নদী যেন থামার নাম নিচ্ছে না। তারা জানেন, মিলন আর ফিরে আসবে না, তবে তারা চান, তাদের স্বামী ও সন্তানের ‘শহিদ’ হওয়ার স্বীকৃতি। তাদের আহাজারি যেন পিপড়ের মতো ধ্বংস করে দেয় নিঃস্বতা এবং অবিচারের দেয়াল।