মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

সর্বশেষ

জুলাই-আগস্টে রাষ্ট্রীয় মদদে হত্যা-নির্যাতন: জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ভয়াবহ চিত্র

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশে গত জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ সহিংসতার চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রায় ১৪০০ জনকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই রাইফেল ও শটগানের গুলিতে নিহত। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।

প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ আনা হয়েছে। আটক করা হয়েছিল প্রায় ১১,৭০০ জনকে। নিহতদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ শিশু ছিল, যাদেরকে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা ও পঙ্গু করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বুধবার (বাংলাদেশ সময় দুপুরে) জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে ওএইচসিএইচআর বাংলাদেশে এসে তদন্ত পরিচালনা করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পদ্ধতিগত ও সংগঠিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অংশ হয়ে উঠেছিল। ঘটনার আরও স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের পরামর্শ দিয়ে রাজনৈতিক দলকে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। র‌্যাব-এনটিএমসি বিলুপ্ত করা এবং সামরিক বাহিনীর কর্মপরিধি সুনির্দিষ্ট করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য কর্মকর্তারা একাধিক বৃহৎ আকারের অভিযানের নির্দেশনা ও তদারকি করেন, যেখানে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করে। নিরাপত্তা বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বিক্ষোভকারীদের হত্যা বা পঙ্গু করার সঙ্গে জড়িত ছিল, যার মধ্যে একদম সামনে থেকে গুলি করার ঘটনাও রয়েছে।

প্রতিবেদনে নারী ও মেয়েদের ওপর হামলা, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হওয়ার বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের হাতে যৌন নির্যাতনের তথ্যও নথিভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার ভিন্নমত দমনে ব্যাপকভিত্তিক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর নির্ভর করেছিল। এমন নিপীড়নমূলক পরিস্থিতিতে বিরোধীরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং প্রতিবাদ সহিংসতার দিকে যায়।

ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি এবং পুলিশের বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা, সিটিটিটিসি-সহ বিভিন্ন বাহিনী ও প্রশাসন কীভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত ছিল, তার বিবরণও প্রতিবেদনে রয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নজরদারির মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য আদান-প্রদান করে এবং নির্বিচারে গ্রেপ্তারে মদদ দেয়। বন্দিদের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য নির্যাতন চালানো হয়। সিটিটিসির সদর দপ্তর বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আহতদের চিকিৎসায় বাধা, হাসপাতালে রোগীদের জিজ্ঞাসাবাদ, আহত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং চিকিৎসাকর্মীদের ভয়-ভীতি দেখানোর অভিযোগও আনা হয়েছে ডিজিএফআই, এনএসআই ও গোয়েন্দা পুলিশের বিরুদ্ধে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন সহায়তাকারী কর্তৃপক্ষ বা বিচার বিভাগ নির্বিচারে আটক ও নির্যাতন বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এবং এসব কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হয়নি।

ফলকার টুর্ক বলেন, “এই নৃশংস প্রতিক্রিয়া ছিল সাবেক সরকারের একটি পরিকল্পিত ও সমন্বিত কৌশল, যারা জনতার বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। … শত শত বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক এবং নির্যাতন চালানো হয়েছে…যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক অপরাধের পর্যায়েও পড়তে পারে।”

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়ে আইন ভঙ্গকারী এবং মানুষের মানবিক ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

পাঠকপ্রিয়