আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আরও ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চেয়েছে বেসরকারি খাতের ইউনিয়ন ব্যাংক। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে এই ধার চাওয়া হয়। চিঠিতে ব্যাংকটির বর্তমান সার্বিক অবস্থাও তুলে ধরা হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউনিয়ন ব্যাংক বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তার নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন ব্যাংকটিতে ব্যাপক লুটপাট করা হয়েছে। এস আলম নামে-বেনামে নিজেই ব্যাংকটি থেকে ২৩ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা সরিয়েছেন, যার মধ্যে ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা এখনও খেলাপি। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরানোর কারণে ব্যাংকটি আর্থিক সংকটে পড়ে যায়।
নতুন সরকার (অন্তর্বর্তী) আসার পর এই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এস আলমমুক্ত করা হয়। সেই সঙ্গে ব্যাংকটিকে সংকট কাটিয়ে উঠতে টাকা ছাপিয়ে ও গ্যারান্টির আওতায় তারল্য সহায়তার ব্যবস্থা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে তাতেও সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। এ অবস্থায় আরও ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধার চাওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, তখন ব্যাংকটির সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে ছাপানো টাকায় ২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। এখন আবার দিলে সেটাও টাকা ছাপিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আপাতত টাকা ছাপিয়ে আর কোনো ব্যাংককে সহায়তা না করার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি শফিউদ্দিন আহমেদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ব্যাংকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৭ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই ২ হাজার কোটি টাকা।
একই সময় ব্যাংক নিজস্ব চেষ্টায় ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ ও আদায় করতে পেরেছে। এর মধ্যে বকেয়া বিনিয়োগ থেকে ৭২৩ কোটি টাকা, নতুন আমানত থেকে ৯৮৬ কোটি, এলসি মার্জিন ও নগদ প্রণোদনা থেকে ২৭ কোটি, রেমিট্যান্স সংগ্রহ থেকে ১৪ কোটি, বন্ড-সিকিউরিটি এবং পেলসমেন্ট থেকে ১৫ কোটি টাকা আদায় করেছে। সবমিলিয়ে ব্যাংকের তহবিল ছিল ৪ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। তবে এই সময় আমানতকারীদের দেনা পরিশোধসহ বিভিন্ন খাতে ৩ হাজার ২০৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকের নিট স্থিতি ৯৬৭ কোটি টাকা।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা যাতে নষ্ট না হয়, তাই নতুন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আরও ২ হাজার কোটি টাকার ধার চাওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংক বলছে, চলমান তারল্য সংকটে সৃষ্ট উত্তোলন চাহিদা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। তবে গ্রাহকের পূর্ণ আস্থা অর্জনে আরও সময়ের প্রয়োজন। তাই গ্রাহকদের উত্তোলন চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দিতে এখনও কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। চলমান অবস্থায় এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান তহবিল দিয়ে খুব অল্প সময় গ্রাহকের উত্তোলন চাহিদা পূরণ করা যাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে বিরাজমান তারল্য সংকট ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিঃসন্দেহে আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য কোনো অবস্থায়ই কাম্য নয়। ক্রমবর্ধমান উত্তোলন চাহিদা, বিভিন্ন সেবা বিলের বকেয়া দাবি পরিশোধ, সরকারি সংস্থাগুলোর বকেয়া ভ্যাট-ট্যাক্স, পরিশোধপূর্বক আমানতকারীর আস্থা অর্জনে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও তারল্য সহায়তা প্রাপ্ত হলে আমরা আমাদের দৈনন্দিন স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হব। এমন অবস্থায় আরও ২ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহয়তা প্রদানের অনুরোধ করছি।