সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সর্বশেষ

হাতের ইশারায় চলে বন্দরনগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা, বিশ্বমানের সিস্টেমের স্বপ্ন অধরা

👤
নিজস্ব প্রতিবেদক
0 Shares
f

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, বিগত কয়েকদিনে ভয়াবহ যানজটের শিকার হয়েছে। ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থাকা সত্ত্বেও, ট্রাফিক বিভাগ হাত উঁচিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে বা লেজার লাইট জ্বালিয়ে সংকেত দেওয়ার পুরনো পদ্ধতিতেই আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানির অপচয়।

প্রধান সড়কগুলোতে সিডিএর উন্নয়ন কাজ, যত্রতত্র পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড, এবং অসংখ্য সিএনজি ও ব্যাটারি রিকশার দৌরাত্ম্যে ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশ্বমানের ট্রাফিক সিস্টেমের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও, বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। অটো ট্রাফিক সিগন্যালিং প্রকল্প চালু না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাস্তার অপ্রতুলতা ও অবৈধ দখল

বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে গড়ে ৩০ শতাংশ রাস্তা ও ফুটপাত থাকলেও, চট্টগ্রামে রয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। রাস্তার স্বল্পতার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং হকারদের দখলে রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত এশিয়ান হাইওয়ে শহরের প্রধান সড়ক হওয়ায়, এখানে যান চলাচল ব্যাহত হলে পুরো শহরে প্রভাব পড়ে। এই রাস্তায় অবৈধ স্ট্যান্ড, হকারদের দোকানপাট এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল গতিশীলতা হারাচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশের সীমাবদ্ধতা ও সিগন্যাল ব্যবস্থার ব্যর্থতা

নগরীর প্রায় দেড়শ’টি মোড়ে অবৈধ স্ট্যান্ডের কারণে বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, টেক্সি ও রিকশাগুলোও মোড় দখল করে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও, অবৈধ স্ট্যান্ড ও পার্কিং ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন আপদ হিসেবে যোগ হয়েছে ব্যাটারি রিকশা, যারা ট্রাফিক আইন অমান্য করে চলাচল করে। স্কুলগুলোর নিজস্ব পার্কিং না থাকায়, রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে যানজট সৃষ্টি হয়।

দামপাড়া থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়ায় দিনের বেলা শহরে বাস প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, নানা উপায়ে সেখানে যানজট লেগে থাকে। জিইসি মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, লালখান বাজার, টাইগার পাস, কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, রেয়াজুদ্দীন বাজার, স্টেশন রোড, কদমতলী, মাঝিরঘাট, আগ্রাবাদ, বারিক বিল্ডিং, বন্দর, সল্টগোলা ক্রসিং, ইপিজেড, সিমেন্ট ক্রসিংসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় দিনভর যানজট থাকে।

ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় থাকলেও, বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। ট্রাফিক সিগন্যালের উন্নতি ও আইন প্রয়োগে কঠোরতা না আনলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় কোটি টাকা খরচ করে ডিজিটাল ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করা হলেও, সেগুলো এখন অকার্যকর। অটো ট্রাফিক সিগন্যাল না থাকায়, পুলিশ হাত ইশারা বা লেজার লাইটের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনা করে।

সমন্বয়ের অভাব ও উদ্যোগের ব্যর্থতা

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের থাকলেও, সিগন্যাল বাতি লাগানোর দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। এই দুই বিভাগের সমন্বয়ের অভাবে অটো সিগন্যালিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮৯-৯০ সালে সিটি কর্পোরেশন সিগন্যাল বাতি লাগালেও, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অটো ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা বাস্তবায়িত হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, বিপুল জনসংখ্যার জন্য রাস্তা অপ্রতুল এবং ধীর গতির গাড়ির আধিক্যের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাস্তার অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি না হলে নগরবাসী এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে না। তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (ডিসি-উত্তর) জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘একটি শহরকে শৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ২৫ শতাংশ সড়কের প্রয়োজন। তবে চট্টগ্রামে সড়ক আছে মাত্র ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে পার্কিংয়ের সংকট। অতি দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে পার্কিং প্লেস নির্ধারণ করা জরুরি।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বন্দরনগরীকে যানজটমুক্ত করতে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেবা সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

পাঠকপ্রিয়

যোগাযোগ: সুপ্রিম মার্কেট, ৩য় তলা , ৩২, এন এ চৌধুরী রোড,  আন্দরকিল্লা , চট্টগ্রাম।
ইমেইল : news@banglarpatrika.com
মোবাইল: ০১৭১১-৮৩০৮৭৩

হাতের ইশারায় চলে বন্দরনগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা, বিশ্বমানের সিস্টেমের স্বপ্ন অধরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৮:২৩

চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী, বিগত কয়েকদিনে ভয়াবহ যানজটের শিকার হয়েছে। ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থাকা সত্ত্বেও, ট্রাফিক বিভাগ হাত উঁচিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে বা লেজার লাইট জ্বালিয়ে সংকেত দেওয়ার পুরনো পদ্ধতিতেই আটকে আছে। এই পরিস্থিতিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, নষ্ট হচ্ছে কর্মঘণ্টা, বাড়ছে জ্বালানির অপচয়।

প্রধান সড়কগুলোতে সিডিএর উন্নয়ন কাজ, যত্রতত্র পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড, এবং অসংখ্য সিএনজি ও ব্যাটারি রিকশার দৌরাত্ম্যে ট্রাফিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশ্বমানের ট্রাফিক সিস্টেমের আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও, বাস্তবায়ন হয়নি কিছুই। অটো ট্রাফিক সিগন্যালিং প্রকল্প চালু না হলে এই সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাস্তার অপ্রতুলতা ও অবৈধ দখল

বিশ্বের উন্নত শহরগুলোতে গড়ে ৩০ শতাংশ রাস্তা ও ফুটপাত থাকলেও, চট্টগ্রামে রয়েছে মাত্র ৯ শতাংশ। রাস্তার স্বল্পতার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং, অবৈধ স্ট্যান্ড এবং হকারদের দখলে রাস্তাগুলোর অবস্থা খুবই শোচনীয়। পতেঙ্গা বিমানবন্দর থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত বিস্তৃত এশিয়ান হাইওয়ে শহরের প্রধান সড়ক হওয়ায়, এখানে যান চলাচল ব্যাহত হলে পুরো শহরে প্রভাব পড়ে। এই রাস্তায় অবৈধ স্ট্যান্ড, হকারদের দোকানপাট এবং অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে যান চলাচল গতিশীলতা হারাচ্ছে।

ট্রাফিক পুলিশের সীমাবদ্ধতা ও সিগন্যাল ব্যবস্থার ব্যর্থতা

নগরীর প্রায় দেড়শ’টি মোড়ে অবৈধ স্ট্যান্ডের কারণে বাসগুলো যাত্রী ওঠানামার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, টেক্সি ও রিকশাগুলোও মোড় দখল করে থাকে। ট্রাফিক পুলিশ সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও, অবৈধ স্ট্যান্ড ও পার্কিং ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন আপদ হিসেবে যোগ হয়েছে ব্যাটারি রিকশা, যারা ট্রাফিক আইন অমান্য করে চলাচল করে। স্কুলগুলোর নিজস্ব পার্কিং না থাকায়, রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে যানজট সৃষ্টি হয়।

দামপাড়া থেকে দূরপাল্লার বাস ছাড়ায় দিনের বেলা শহরে বাস প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, নানা উপায়ে সেখানে যানজট লেগে থাকে। জিইসি মোড়, ষোলশহর দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, লালখান বাজার, টাইগার পাস, কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, রেয়াজুদ্দীন বাজার, স্টেশন রোড, কদমতলী, মাঝিরঘাট, আগ্রাবাদ, বারিক বিল্ডিং, বন্দর, সল্টগোলা ক্রসিং, ইপিজেড, সিমেন্ট ক্রসিংসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় দিনভর যানজট থাকে।

ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় থাকলেও, বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। ট্রাফিক সিগন্যালের উন্নতি ও আইন প্রয়োগে কঠোরতা না আনলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একসময় কোটি টাকা খরচ করে ডিজিটাল ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম চালু করা হলেও, সেগুলো এখন অকার্যকর। অটো ট্রাফিক সিগন্যাল না থাকায়, পুলিশ হাত ইশারা বা লেজার লাইটের মাধ্যমে যানবাহন পরিচালনা করে।

সমন্বয়ের অভাব ও উদ্যোগের ব্যর্থতা

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশের থাকলেও, সিগন্যাল বাতি লাগানোর দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের। এই দুই বিভাগের সমন্বয়ের অভাবে অটো সিগন্যালিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৮৯-৯০ সালে সিটি কর্পোরেশন সিগন্যাল বাতি লাগালেও, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অটো ট্রাফিক সিগন্যাল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তা বাস্তবায়িত হয়নি।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি আশিক ইমরান বলেন, বিপুল জনসংখ্যার জন্য রাস্তা অপ্রতুল এবং ধীর গতির গাড়ির আধিক্যের কারণে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। রাস্তার অবৈধ দখলদারিত্ব বন্ধ এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি না হলে নগরবাসী এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে না। তিনি গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে আনার উপর গুরুত্বারোপ করেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের (ডিসি-উত্তর) জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘একটি শহরকে শৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য ২৫ শতাংশ সড়কের প্রয়োজন। তবে চট্টগ্রামে সড়ক আছে মাত্র ১০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান সমস্যা হচ্ছে পার্কিংয়ের সংকট। অতি দ্রুত চট্টগ্রাম শহরে পার্কিং প্লেস নির্ধারণ করা জরুরি।’

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বন্দরনগরীকে যানজটমুক্ত করতে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট সবগুলো সেবা সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন।’